ময়মনসিংহ অফিস
টানা সাড়ে আট ঘণ্টার ভারী বর্ষণে ময়মনসিংহ নগরী কার্যত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। এ দিকে বসতঘরে জমে থাকা পানিতে ডুবে আট মাস বয়সী এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। চলতি বছরে জেলায় এটিই সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সকাল ১০টার দিকে নগরীর ব্রাহ্মপল্লী এলাকায় নানাবাড়িতে আট মাস বয়সী আয়াশ নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে সেহড়া মুন্সীবাড়ি এলাকার আবিদ ও বন্যা দম্পতির ছেলে। শিশুটির ফুফুর ভাষ্য, বৃষ্টির সময় শিশুটিকে নিয়ে তার মা ঘুমিয়ে ছিলেন। একপর্যায়ে আয়াশ বিছানা থেকে গড়িয়ে ঘরের জমে থাকা পানিতে পড়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করা হলেও আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। খবর পেয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। ভারী বর্ষণে নগরীর গাঙ্গিনারপাড়, নতুনবাজার, জেলা স্কুল মোড়, চরপাড়া, সানকিপাড়া, আকুয়া, গোলকীবাড়ী, পুরোহিতপাড়া, বলাশপুর, কেওয়াটখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। বহু বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন। অনেক পরিবার রান্না করতে না পেরে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হয়। সেহড়া মুন্সীবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, বসতঘরে পানি জমে যাওয়ায় রান্না করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে পরিবার নিয়ে হোটেলের খাবার খেয়েছি। সানকিপাড়ার বাসিন্দা মিন্টুও একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানান। চরপাড়া মোড়ে জলাবদ্ধতার কারণে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসতে ভোগান্তিতে পড়েন জামালপুরের আবুল বাশার। তিনি বলেন, হাঁটুসমান পানির কারণে কয়েকশ’ মিটার পথ অতিক্রম করতেই অ্যাম্বুলেন্সের এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। হাসপাতাল চত্বরে পানি ওঠায় রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকার ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ-ব্যবস্থা, খাল দখল এবং চলমান উন্নয়নকাজের কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হচ্ছে না। ফলে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। একই এলাকার বাসিন্দা হামিদা আক্তার বলেন, ড্রেন পরিষ্কার না থাকায় বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট হয়েছে।
সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সঙ্ঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। স্থায়ী সমাধানের জন্য আধুনিক ড্রেনেজ-ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। শহরের অনেক ড্রেনের মাঝখানে বিদ্যুতের খুঁটি থাকায় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি ইয়াজদানী কোরাইশী কাজল বলেন, পরিকল্পিত ড্রেন খনন ও কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে নগরবাসী প্রতি বর্ষাতেই একই দুর্ভোগে পড়বে।
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও ড্রেন ও খাল পরিষ্কার করায় দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে। সকাল থেকেই তিনি বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করছেন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠে কাজ করছেন। তিনি বলেন, মূলত অলিগলিতে পানি জমে রয়েছে। বহুতল ভবনের মালিকরা অপরিকল্পিতভাবে ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা ফেলায় পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, সড়ক উন্নয়ন ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্কসহ নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণ প্রকল্পের আওতায় ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীতে ৩২২ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পের মাত্র ৫৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলছে না নগরবাসীর।



