ফের ধারাবাহিক পতনের দিকে পুঁজিবাজার

কারসাজি প্রতিরোধে বিএসইসি-ডিএসই বৈঠক

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বাজেট পরবর্তী প্রথম সপ্তাহটি ভালোভাবে পার করলেও গতকাল নিয়ে টানা দুই দিন দরপতনের শিকার হয়েছে পুঁজিবাজার। গত রোববার পতনের মাত্রা সহনীয় থাকলেও গতকাল ছিল বিনিয়োগকারীদের জন্য শঙ্কার। গতকালের পুঁজিবাজার আচরণ দেখে তাদের প্রশ্ন আবার কি ধারাবাহিক পতনের দিকে যাচ্ছে পুঁজিবাজার?। পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন কমিশনের কঠোর নজরদারির ঘোষণার পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ থেকে প্রকাশ করা দুর্বল ও বন্ধ কোম্পানিগুলোর দু’টি তালিকা, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষে আদালতের রায় সবকিছু মিলিয়ে বাজারে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে বাজারে বিক্রয়চাপ তৈরি হচ্ছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৮৫ দশমিক ৭১ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। ৫ হাজার ৬৩৯ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি লেনদেনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৫৫৪ দশমিক ১৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ৫০ ও ১৯ দশমিক ৩০ পয়েন্ট।

অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১৭৭ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট হারায়। সোমবার সকালে ১৫ হাজার ২৪৯ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে ১৫ হাজার ৭১ দশমিক ৯৯ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩০ দশমিক ২২ ও ১০২ দশমিক ০৭ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি ঢাকা বাজারে লেনদেনেরও বড় ধরনের অবনতি ঘটে গতকাল। ডিএসই এদিন ৮৭৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১২৬ কোটি টাকা কম। রোববার বাজারটির লেনদেন ছিল এক হাজার দুই কোটি টাকা। তবে গতকাল লেণদেনর উন্নতি ঘটেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। সিএসই ৭৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে গতকাল যা আগের দিনের চেয়ে ৪৪ কোটি টাকা বেশি। রোববার সিএসইর লেনদেন ছিল ৩০ কোটি টাকা।

দিনের বাজার আচরণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু মতামত পাওয়া গেছে। বাজারের একটি অংশ মনে করছেন, সম্প্রতি ডিএসই কর্তৃপক্ষ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করতে বন্ধ ও নিরীক্ষকদের বিবেচনায় দুর্বল কোম্পানিগুলোর দু’টি তালিকা প্রকাশ করেছে যেখানে ৬২টি কোম্পানির নাম রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মৌলভিত্তির দিক থেকে দুর্বল ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা এসব কোম্পানির শেয়ার নিয়ে এক শ্রেণীর বিনিয়োগকারীরা কারসাজিতে লিপ্ত রয়েছে। অথচ নতুন সরকার ও নতুন কমিশন একটি স্বচ্ছ ও বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থাশীল একটি বাজার পুনর্গঠনের জন্য ওয়াদাবদ্ধ। ডিএসইর এ তালিকা প্রকাশ তারই অংশ যাতে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক থাকে। এর ফলে এসব কোম্পানিতে বড় ধরনের বিক্রয়চাপ তৈরি হচ্ছে।

প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউজের সিইও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারের শৃঙ্খলা ফেরাতে তথা যে কোন ধরনের কারসাজির বিরূদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে এ ধরনের বার্তা রয়েছে বাজারে। তা ছাড়া সম্প্রতি আদালত কর্তৃক স্থগিত করা মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালার বিরুদ্ধে বিএসইসির করা আপিলে আদালত এ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে। এতে এসব ফান্ডে অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ফান্ডে থাকা শেয়ারগুলো বাজারে ছেড়ে দিতে হবে। এতে বাজারে বড় ধরনের বিক্রয়চাপ তৈরি হতে পারে। এরই প্রভাব পড়ছে বাজারে।

অন্য দিকে বাজারের একটি অংশ মনে করছে সামনে জুন মাস শেষ হচ্ছে। এ সময় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ষান্মাসিক হিসাব বিবরণী তৈরি করবে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে বাজারে বিক্রয়চাপের প্রাবল্য দেখা যায়। তাদের ভাষায় এ প্রবণতা আরো কয়েক দিন বলবৎ থাকতে পারে। তবে তারা মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট সময় বিশেষ করে জুন ক্লোজিং শেষ হলে বাজার আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

তবে গতকালের বাজার আচরণে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ। মতিঝিলে ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজে উপস্থিত বিনিয়োগকারীদের সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তারা তাদের এ শঙ্কার কথা জানান। তারা প্রশ্ন রাখেন, দীর্ঘ পতনের পর কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে যাওয়া বাজার কি আবার ধারাবাহিক পতনের দিকে যাচ্ছে?

এ দিকে শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বাজার কারসাজি প্রতিরোধে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পিএলসির সার্ভেইল্যান্স টিমের সাথে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (২১ জুন) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিএসইসি ভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

বৈঠকে বিএসইসির পক্ষ থেকে চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) তানভীর হাবিব রহমান, কমিশনার নাহিদ মাহতাব, কমিশনার মো: নাফিজ আল তারিক, বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্য দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার এবং চিফ রেগুলেটরি অফিসারের (ভারপ্রাপ্ত) দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বৈঠকে অংশ নেন।

আলোচনায় দেশের শেয়ারবাজারের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বের সাথে উঠে আসে। একই সাথে বাজারের স্বচ্ছতা বজায় রাখা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা এবং যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও কারসাজি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেয়া হয়। এ ছাড়া বৈঠকে সাম্প্রতিক সময়ে বাজার কারসাজি প্রতিরোধে ডিএসই যে বিভিন্ন ব্যবস্থা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেগুলোর বিষয়েও বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

এ সময় বিএসইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও কার্যকর শেয়ারবাজার প্রতিষ্ঠায় কমিশন দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ছাড়া সব ধরনের বাজার কারসাজি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সর্বোত্তম অনুশীলন অনুসরণ করে স্টক এক্সচেঞ্জের রিয়েল-টাইম সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সাথে বৈঠকে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষে বিদ্যমান সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের বিভিন্ন দিক নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।