পরিকল্পনা উপদেষ্টার গাফিলতিতে অবশেষে ঝুলে গেল বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারে বিপর্যস্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৬ জেলার ১২৩ উপজেলার জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও পানিনিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
একাধিক দশক ধরে আলোচনা, প্রাক-সম্ভাব্যতা ও পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষে অবশেষে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগোয়। গত ১৫ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটির বাস্তবায়নে প্রাথমিক সম্মতি দেয়া হয় এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও পরিকল্পনা উপদেষ্টার অনুমতি না থাকায় একনেক সভায় প্রকল্পটি উত্থাপন করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি একনেকে না ওঠার পেছনে ভারতের আপত্তির বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে নতিস্বীকারমূলক অবস্থান নিয়েছে বলেই এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প আটকে গেছে। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার এখন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন; নির্বাচিত সরকার এসে প্রকল্পটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা, বারবার বাধা
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। ষাটের দশক থেকে ভারত গঙ্গাসহ কয়েকটি নদী থেকে আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬১ সালেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পানি উন্নয়ন বোর্ড পদ্মা নদীর পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে সমীক্ষা চালায়। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সাল পর্যন্ত পাউবো চারটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে।
২০০২ সালে পানিসম্পদের সামষ্টিক পরিকল্পনাকারী সংস্থা ওয়ারপো কুষ্টিয়া বা রাজবাড়ী এলাকায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে। ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তৃত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন সম্পন্ন হয়।
ভারতের আপত্তি ও নথি হিমাগার
নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন এবং যৌথ কারিগরি উপকমিটি গঠন করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে যৌথ নদী কমিশনসহ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ভারত প্রবল আপত্তি তোলে। এর ফলে ২০১৮ সালে প্রকল্প-সংক্রান্ত নথি কার্যত হিমাগারে তুলে রাখা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দেশের ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবনে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠক করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ফারাক্কার ধ্বংসাত্মক প্রভাব
নথিতে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে ভারত ফারাক্কা ব্যারাজ চালু করার পর পদ্মার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ ১৫০০ কিউসেক থেকে কমে সর্বনিম্ন ১৭০ কিউসেকে নেমে আসে। এর ফলে পদ্মানির্ভর দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকার নদীব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল-ইছামতিসহ বহু নদী সিস্টেম কার্যত মৃত হয়ে পড়ে।
উজানের প্রবাহ না থাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী ভরাট, জলাবদ্ধতা, সুপেয় পানির সঙ্কট এবং সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ধ্বংসের আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। বরেন্দ্র এলাকাতেও ভূগর্ভের পানির সঙ্কট ও আর্সেনিক দূষণ বেড়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে কী মিলত
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বর্ষা শেষে পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে নদী ও সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহ সম্ভব হতো। প্রকল্পের আওতায় মূল ব্যারাজ, গড়াই, চন্দনা ও হিসনা অফটেক, হাইড্রো পাওয়ার প্ল্যান্ট, নদী ড্রেজিং ও পুনঃখননের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে প্রায় ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে ভাটিতে ৫৭০ কিউসেক পানি ছাড়া সম্ভব হতো।
আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পানি আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। তার মতে, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়ন না হলে দেশের দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিপর্যয় কাটবে না।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের দফতর থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, সময় স্বল্পতার কারণে প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপন করা যায়নি। নির্বাচন সামনে রেখে সরকার এখন নির্বাচন আয়োজনেই মনোযোগী। আগামী একনেক বা পরবর্তী নির্বাচিত সরকার প্রকল্পটি অগ্রাধিকার দেবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।



