চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর পাহাড়ের ভাঁজে ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র!

সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য গুঁড়িয়ে দিতে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের তাগিদ

Printed Edition

আরফাত বিপ্লব চট্টগ্রাম ব্যুরো

জঙ্গল সলিমপুর। নামের মধ্যেই যেন এক প্রচ্ছন্ন আতঙ্কের ছাপ! চট্টগ্রাম নগরীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা সীতাকুণ্ড উপজেলার পাহাড়ঘেরা দুর্গম এ জনপদটি দীর্ঘ সময় ধরেই সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য এবং অবৈধ অস্ত্র তৈরির নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে সর্বশেষ র‌্যাবের ওপর সশস্ত্র হামলা এবং এক কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনা এখানকার পরিস্থিতিকে ভিন্ন ও ভয়াবহ এক মাত্রায় নিয়ে গেছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ এলাকাটি যেভাবে সন্ত্রাসীদের শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে, তাতে একক কোনো বাহিনীর পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দুর্গম এ পাহাড়ি জনপদকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে এখন সেনাবাহিনী, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটলিয়ন (র‌্যাব) ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি ‘সাঁড়াশি অভিযান’ ছাড়া বিকল্প নেই।

গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি) জঙ্গল সলিমপুরে র‌্যাব-৭ পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত গুলিবর্ষণে নিহত হন নায়েক সুবেদার মো: মোতালেব হোসেন ভূঁঁইয়া। এ ঘটনায় গুরুতর আহত আরো তিন র‌্যাব সদস্য হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন। এ ঘটনা আবারো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে কতটা ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র।

স্থানীয় বাসিন্দা ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জঙ্গল সলিমপুর অপরাধীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। পাহাড়ের দুর্গম পথ এবং ঘন জঙ্গল ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা সহজেই আত্মগোপন করতে পারে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির লক্ষ্যে একটি বিশেষ গোষ্ঠী এখানে অস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, র‌্যাবের ওপর হামলার ধরন দেখে বোঝা যায়, সন্ত্রাসীরা অত্যন্ত সঙ্ঘবদ্ধ এবং তাদের কাছে ভারী অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। তারা র‌্যাবের গতিবিধি আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল এবং সুবিধাজনক অবস্থান থেকে হামলা চালিয়েছে। এমতাবস্থায় বিচ্ছিন্ন বা ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে এ নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। নির্বাচনের আগে এ এলাকাটি কার্যত ‘বারুদের স্তূপে’ পরিণত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জানমালের জন্য বড় হুমকির কারণ।

অস্ত্র তৈরির কারখানা : জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র তৈরির কারখানা থাকার বিষয়টি নতুন নয়। এর আগেও এখানে বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। গত বছরের ৩০ আগস্ট সেনাবাহিনী জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছিল। সে অভিযানে একটি দেশীয় অস্ত্র তৈরি কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। এ সময় চারজন সন্ত্রাসীকে আটক করার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছিল। উদ্ধারকৃত সরঞ্জামের তালিকায় ছিল ছয়টি দেশীয় অস্ত্র, ৩৫ রাউন্ড খালি কার্তুজ, ৫ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ১টি চাইনিজ কুড়াল, ২০টি ছুরি, ওয়াকিটকি চার্জার, মেগাফোন এবং প্যারাসুট ফ্লেয়ার। সেনাবাহিনীর সে অভিযানের তথ্য-উপাত্ত প্রমাণ করে যে, এলাকাটি দীর্ঘ দিন ধরেই একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যারা আধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম (ওয়াকিটকি) ব্যবহার করে নিজেদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।

র‌্যাব ডিজির ঘটনাস্থল পরিদর্শন : এ দিকে, সহকর্মী হারানোর শোকের মধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন র‌্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান। জানাজা শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠা থেকে এখন পর্যন্ত ৭৫ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। তবে আমরা মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পিছু হটব না।’

তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের এ অবৈধ আস্তানা এবং অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে র‌্যাব বদ্ধপরিকর। প্রয়োজনে সন্ত্রাসীদের পুরো আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তিনি শহীদ মোতালেবের হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তার পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণাও দেন। তবে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, র‌্যাবের একার পক্ষে এ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।

নড়েচড়ে বসেছে সব বাহিনী : পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র‌্যাব এবং পুলিশের সমন্বয়ে একটি ‘জয়েন্ট টাস্কফোর্স’ বা যৌথবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি অভিযান পরিচালনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’ ওই ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘অতীতে সেনাবাহিনী যেমন অস্ত্র কারখানা ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল, ঠিক তেমনি বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযানই পারে আসন্ন নির্বাচনের আগে এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। যতদিন পর্যন্ত এ এলাকার প্রতিটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং শেষ সন্ত্রাসী গ্রেফতার না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ক্যাম্প স্থাপন করে অভিযান অব্যাহত রাখাই হবে সঙ্কট নিরসনের একমাত্র পথ।’