২ বছরেও চালু হয়নি সিলেটের দু’টি এক্সেল লোড কন্ট্রোলার

বাকি ৩টির কাজই শুরু হয়নি

Printed Edition
সিলেট-সুনামগঞ্জ রোডের লামাকাজী (বামে) ও সিলেট-ভোলাগঞ্জ রোডের এক্সেল লোড কন্ট্রোলার স্টেশন (ডানে) : নয়া দিগন্ত
সিলেট-সুনামগঞ্জ রোডের লামাকাজী (বামে) ও সিলেট-ভোলাগঞ্জ রোডের এক্সেল লোড কন্ট্রোলার স্টেশন (ডানে) : নয়া দিগন্ত

এম জে এইচ জামিল সিলেট ব্যুরো

টেকসই, নিরাপদ ও ব্যয়সাশ্রয়ী সড়ক অবকাঠামো এবং সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাঁচ বছর আগে সারা দেশের মতো সিলেটেও পাঁচটি এক্সেল লোড কন্ট্রোলার স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। দু’টি স্টেশনের কাজ শেষ হওয়ার দুই বছরেও চালুর উদ্যোগ নিতে পারেনি সড়ক ও জনপথ অধিদফতর-সওজ সিলেট। এতে এক দিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্য দিকে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মহাসড়কগুলো।

জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ২০১৯ সালে সারা দেশে ২৮টি এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ)। এর মধ্যে সিলেটে পাঁচটি এক্সেল লোড কন্ট্রোলার স্টেশনে স্থাপনে ব্যয় ধরা হয় ৮০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদকাল ছিল ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত।

সওজ সিলেট সূত্র জানা গেছে, সিলেট বিভাগের পাঁচটি মহাসড়কের মধ্যে সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়ক, বিমানবন্দর-বাদাঘাট সড়ক, সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক, সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক এবং শেওলা-সুতারকান্দি সড়কে পাঁচটি এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মধ্যে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক বাদে অন্য চারটি সড়ক-মহাসড়কে এই নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র বসাতে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৬৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে এক্সেল লোড কন্ট্রোলার স্টেশনটি মূলত ঢাকা-সিলেট- তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে (দু’টি সার্ভিস লেনসহ ছয় লেন) উন্নীতকরণ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে এই নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপনেও ১৫ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে প্রথম স্টেশনের কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের লামাকাজী অ্যাডমিরাল এম এ খান সেতুর পশ্চিম পাশে সেন্টারটির কাজ ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে শেষ হয়। এতে ব্যয় হয়েছে ১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা।

অন্য দিকে সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কে ভোলাগঞ্জ ধলাই সেতুর দক্ষিণে লোড কন্ট্রোল ও টোল প্লাজার কাজও ২০২৩ সালে শেষ হয়েছে। এতে ব্যয় হয় ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। যানবাহন থেকে টোল ও অতিরিক্ত লোডের কারণে জরিমানার পরিমাণের অনুমোদন পেলে সেটিও চালু করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।

সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের লামাকাজী এম এ খান সেতুসংলগ্ন এক্সেল লোড কন্ট্রোলার স্টেশন ও সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কে ভোলাগঞ্জ ধলাই সেতুর দক্ষিণে নির্মিত লোড কন্ট্রোল ও টোল প্লাজা পুরোপুরি ব্যবহার উপযোগী হলেও অদৃশ্য কারণে স্টেশন দু’টি চালু হচ্ছে না। এতে অতিরিক্ত বালু পাথরসহ পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলো নির্বিঘেœ সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও সরকারের ৩১ কোটি টাকার স্টেশনগুলো দুই বছর ধরে অলস পড়ে আছে।

এ দিকে সওজ সিলেট সূত্র জানিয়েছে, বাকি তিনটি স্টেশনের কাজ শেষ হলে একসাথে পাঁচটি স্টেশন চালু করা হবে। এই তিনটি স্টেশনের মধ্যে শুধু শেওলা-সুতারকান্দি সড়কে নির্মাণাধীন এক্সেল লোড কন্ট্রোলার স্টেশনের জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে মাত্র। কাজ শুরু হতে আরো বছরখানেক লাগতে পারে। এটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিমানবন্দর-বাদাঘাট সড়ক এবং সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে এক্সেল লোড কন্ট্রোলার স্টেশনের নির্মাণ কাজ শুরু কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি। ফলে প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চিয়তা। এর মধ্যে বিমানবন্দর-বাদাঘাট সড়কের এক্সেল লোড কন্ট্রোলার স্টেশনের জন্য নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ কোটি টাকা।

জানা গেছে, সিলেটের বিভিন্ন সড়কে পাঁচটি এক্সেল লোড কন্ট্রোল সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও চার বছরে পাঁচটির মধ্যে দু’টির নির্মাণকাজ শেষ করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)। কিন্তু নির্ধারিত ওজনের চেয়ে অতিরিক্ত মালপত্র বহনকারী যানবাহনকে কী পরিমাণ জরিমানা গুনতে হবে, তা নির্ধারিত না হওয়া এবং মন্ত্রণালয় থেকে চালুর অনুমোদন না দেয়ায় এগুলোর উদ্বোধন আটকে আছে।

ইতোমধ্যে অনুমোদনের প্রস্তাবনা সিলেট সওজ থেকে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে তিন মাসের জন্য পরীক্ষামূলক চালু করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সেন্টার দু’টি চালু হলে জনগুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়ক সিলেট-সুনামগঞ্জ ও সিলেট-ভোলাগঞ্জে যানবাহনের ওভারলোড নিয়ন্ত্রণসহ দুর্ঘটনা ঠেকানো যাবে। গত কয়েক বছরে ওই দুই সড়কে ভারী পরিবহন উল্টে হতাহতের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

দু’টি সেন্টারের কাজ শেষ হলেও অপর তিনটির নির্মাণকাজই শুরু হয়নি। এর মধ্যে বিয়ানীবাজার উপজেলার সুতারকান্দি এক্সেল লোড কন্ট্রোল সেন্টারের জন্য জমি অধিগ্রহণের পর ঠিকাদার নিয়োগ চলছে। সিলেট সদরের বাদাঘাট সেন্টার পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অপরটি তামাবিল সেন্টারের নির্মাণকাজ ঢাকা-সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে তিনটি সেন্টারের নির্মাণকাজ কবে শুরু হবে, নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে সওজ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন নয়া দিগন্তকে জানান, দু’টি সেন্টারের কাজ শেষ হওয়ায় তা চালুর জন্য প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন এলেই উদ্বোধন করা হবে।

বাকি তিনটি নির্মাণের অপেক্ষা না করে দুই বছর আগে নির্মাণকাজ হওয়া স্টেশন দু’টি চালুর জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন সিলেটবাসী। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় দেখি টাকার অভাবে বিভিন্ন প্রকল্প বন্ধ করা হয়। অথচ সরকারের ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি স্থাপনা দুই বছর ধরে অলস পড়ে থাকা রাষ্ট্রের জন্য ভালো নয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে নির্মিত স্টেশনগুলো দ্রুত চালু করা উচিত।