এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব ও নাটের গুরু, আয়নাঘরের কারিগর, গুম, খুন ও দুর্নীতির সাথে জড়িত সাবেক ডিজিএফআইয়ের শীর্ষ দুই সেনাকর্মকর্তা সাবেক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন ও শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে এবার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলার আবেদন করা হয়েছে। আগামী ৭ এপ্রিল এই শীর্ষ দুই সাবেক সেনাকর্মকর্তাকে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে হাজির করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। মামলাটির তদন্ত করবেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি প্রধান) মো: শফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আমার কাছে যে ১১ মামলার তথ্য রয়েছে সেগুলো নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। এরই মধ্যে গ্রেফতার সাবেক লে. জেনালের মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে পাঁচ দিনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে অধিকতর তদন্ত করার জন্য গতকাল আরো ছয় দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়।
এক-এগারের কুশীলব, আয়নাঘর নির্মাণ এবং গুম-খুন ও অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানোর স্বীকারোক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবি প্রধান বলেন, এই মামলা মূলত ট্রাইব্যুনাল তদন্ত করবে। এসব বিষয়ে আমরা তেমন জিজ্ঞাসাবাদ করিনি। তিনি বলেন, গ্রেফতার দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে অর্থপাচার এবং অবৈধ ব্যবসাবাণিজ্যসহ বিভিন্ন ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন তিনি কোনো ব্যবসা এমনকি অবৈধ কারবারের সাথে জড়িত নন। তিনি বিদেশে গিয়ে ভিসা এনে সেই ভিসা বিক্রি করতেন। তিনি মানবপাচারের কথা স্বীকার করেননি। ডিবি প্রধান বলেন, আমরা মানবপাচারসহ সব মামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত করছি। মানিলন্ডারিং এবং মানবপাচারের বিষয়ে সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়ার পর সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যাচাইয়ের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে মামলার তদন্তভার হস্তান্তর করব।
ডিবির একাধিক সূত্র জানায়, এক-এগারো, আয়নাঘর, গুম, খুনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ডিবির এখতিয়ারভুক্ত না থাকায় ওই সব ঘটনার মামলা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়েছে। এর পর থেকে ওই সব মামলা তদন্ত করবে ট্রাইব্যুনাল।
অপর দিকে সেনাসদস্যদের অর্থ আত্মসাৎ ও জলসিঁড়ির দুর্র্র্নীতির যে তথ্যগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর বিষয়ে জলসিঁড়ি কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো অভিযোগ করেনি। ফলে যে মামলাগুলো আছে সেগুলো নিয়েই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ওই সূত্র জানায়, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুইজনকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে; কিন্তু অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না। গ্রেফতার দুই কর্মকর্তার বিষয়ে আরো গভীর তদন্ত প্রয়োজন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তাদের সময় গুম, খুন ও তৈরি করা আয়নাঘরনের দায় নিচ্ছে না। তারা বলছেন, এসব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা করেছেন। একই সাথে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের নানা উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে তারা সেই সরকারের গুণগান গেয়েছেন।
কিছু ক্ষেত্রে গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও করছেন। সেনাসমর্থিত এক-এগারোর সরকার গঠন, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা, ক্ষমতাসীন দুই নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার, রাজনৈতিক দরকষাকষিসহ নানা প্রশ্ন করা হলেও আসানুরূপ কোনো উত্তর মিলেনি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
সূত্র বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ প্রধান দু’দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কেন গ্রেফতার করা হয়- এই গ্রেফতারে কোন কোন দেশের সবুজ সঙ্কেত ছিল, গ্রেফতারের অভিযান শুরুর আগে কখন কোথায় নীতিনির্ধারণী বৈঠক হয়, ওই বৈঠকে কারা ছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দাবি করেন, তিনি আদেশ পালন করতে গিয়ে গ্রেফতার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন মাত্র।
মাসুদের কাছে গোয়েন্দাদের প্রশ্ন ছিল, গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক হিসেবে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গ্রেফতারের আগে আপনি অনুমোদন দিতেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হয়েছে। এ প্রশ্নের জবাবে অনুমোদনের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, প্রতিটি সেক্টর ধরে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে গ্রেফতারের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনী মিলে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিত।
এক-এগারোর সময়কালে জরুরি অবস্থা জারির পর দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স গঠিত হয়- এই টাস্কফোর্সের সমন্বয় করতেন আপনি। তবে দুর্নীতি দমনের নামে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেন আপনারা- এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই সেনাকর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমি সারা জীবন সৎপথে উপার্জন করে জীবন নির্বাহ করেছি।’ তবে তার এ বক্তব্য সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
এ দিকে গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দু’টি মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যা ও শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ আনা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৭ এপ্রিল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে হাজির করার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ মামুন খালেদ এবং মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর’ এবং ‘দুষ্কৃতকারী’। তাদের অতীতের বহু কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে।
এ দিকে সাবেক সেনাকর্মকর্তা, সাংবাদিক, ডিফেন্স জার্নাল-এর সম্পাদক গতকাল তার ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে লেখেন, এক-এগারোর সময় ‘অতিগোপনীয়’ চিহ্নিত একটি ঢাউস ফাইল নিয়ে আসে আমার অফিসে। ডিজিএফআই পুরো দেশে ৩০০ আসনে নির্বাচনের যে জরিপ চালিয়েছিল সেসবের পুরো তথ্য ছিল তাতে। আসনভিত্তিক সব রাজনৈতিক দলের কোন নেতার অবস্থা কীরূপ তার বিস্তারিত দলিল বলা যায় ওটাকে। সেটি নেড়েচেড়ে দেখি বিএনপি ১৫৫ থেকে ১৬০টি আসনে এগিয়ে আছে। যদি জামায়াতের সাথে জোটভিত্তিক নির্বাচন হয় তাহলে তা আরো কিছু বাড়বে। এনএসআইয়ের রিপোর্টেও প্রায় একই চিত্র; কিন্তু তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ বলেন, বিএনপিকে ৩০টির বেশি আসন দেয়া যাবে না।



