নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গুম হওয়া অনেক বিরোধী নেতা আয়নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু ১৫ বছর আগে গুমের শিকার চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং আহল্লা করলডেঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বাচার সন্ধান এখনো মেলেনি। বাচার ছোট ভাই একই ইউনিয়ন থেকে পরে কয়েক দফায় নির্বাচিত চেয়ারম্যান মো: হামিদুল হক মান্নান বলেছেন, গুমের শিকার ভাইকে মেরে ফেলা হয়েছে নাকি বেঁচে আছে, অন্তত সেই বিষয়টি আমাদের নিশ্চিত করুন। তবে এই পর্যায়ে তার পরিবার হতাশ। ভাইকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন বলেও তিনি জানান।
২০১০ সালের ৮ নভেম্বর গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে সাদা পোশাকধারী লোকজন প্রশাসন পরিচয়ে তুলে নেন নজরুল ইসলাম বাচা চেয়ারম্যানকে। এর পর থেকে ১৫ বছরেও তার সন্ধান পাননি পরিবারের সদস্যরা। গুমের রহস্য নিষ্পত্তি হয়নি। বাচা চেয়ারম্যানকে গুমের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন অনেকটা ফেরারি জীবনে। পরিবারের সদস্যদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খড়গ থেকে বাঁচতে বাচা চেয়ারম্যানের স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে দিন কাটিয়েছেন। বাচা চেয়ারম্যানের ৮০ বছরের বেশি বয়সী বৃদ্ধা মা ছেলের ছবি দেখে দেখে এখনো ছেলে ফিরবে এমন প্রতীক্ষায় দিন কাটান। স্ত্রী-সন্তানরাও প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন হয়তো ফিরে আসবে।
গুম হওয়া বাচা চেয়ারম্যানের ভাই বোয়ালখালীর ১০ নং আহল্লা করলডেঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান হামিদুল হক মান্নান বলেন, ২০১০ সালের ৮ নভেম্বর ইউনিয়ন পরিষদের একটি মামলার রায়ের ব্যাপারে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই আমার ভাইকে ধরে গাজীপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে র্যাব-৭ এ পাঠানো হয়েছিল এমন খবরে এলাকার জনগণ র্যাব অফিসের সামনে জড়ো হলে ব্যাপক লাঠিপেটা করে অনেককে আহত করা হয়। পরে ভাইকেও আর খুঁজে পায়নি। ১৫ বছর ধরে ভাইকে খুঁজে না পাওয়ার ব্যথা বুকে ধারণ করে বেড়াচ্ছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, প্রচলিত আইনে অন্তত সাত বছর নিখোঁজ না থাকলে কাউকে আইনত নিখোঁজ বা মৃত ঘোষণা করা যায় না। এর তাৎপর্য হচ্ছে, ওই ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যত টাকাই থাকুক না কেন, তার নমিনী বা উত্তরাধিকারী সে টাকা তুলতে পারেন না। গুম হয়ে যাওয়া অনেক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও তাদের পরিবার অর্থাভাবে নিদারুণ কষ্ট এবং দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিষয়টি খুবই পীড়াদায়ক। বাচা চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রেও যেহেতু এখনো গুমের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি, তাই তার পরিবারের সদস্যরাও একই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। গুম কমিশন এ ব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
হামিদুল হক মান্নান বলেন, ২০১০ সালের ৮ নভেম্বর আমার ভাই গুম হয়েছেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও কোনো সন্ধান পাইনি। শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর আমাদের অনেক নেতাকর্মী আয়নাঘর থেকে বের হয়েছেন। আরো অনেক নেতাকর্মী এখনো গুম রয়েছেন। তাই তাদের মধ্যে যদি আমার ভাই বেঁচে থাকেন তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টার কাছে সন্ধান চাই। আমার ভাই গুমের শিকার। তাকে সাদা পোশাকে নিয়ে গেছে। গত ১৫ বছর ধরে আমরা অপেক্ষা করেছি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, পরিবারের একজন সদস্য যখন গুম হন তার সহায়-সম্পদ থাকলেও পরিবারের সদস্যরা সেখানে হাত দিতে পারেন না। আমি নিজে চেয়ারম্যান হয়েও আমার ভাইয়ের পরিবারের সদস্যদের ওয়ারিশ সনদ দিতে পারিনি। গুম কমিশনে আমরা দরখাস্ত করেছি। যতটুকু জেনেছি তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে। গুম হওয়া পরিবারগুলোর সবারই একটিই চাওয়া- অন্তত কঙ্কালটা হলেও ফেরত দেন। তার ভাই বাচা চেয়ারম্যানের দুই সন্তানই বিদেশে আছেন বলেও তিনি এ প্রতিবেদককে জানান।



