হাবিবুল বাশার
আমার পৃথিবীটাই ছিল ছেলেটা। ওকে হারানোর পর আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেছে। আমি আর কিছু চাই না, যারা আমার সন্তানকে হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন জুলাই আন্দোলনের ১৯ জুলাই বনশ্রীর শহীদ কিশোর আশিকুল ইসলামের মা। ব্যবসা আর আগের মতো চালাতে পারেন না, স্বাভাবিক জীবনেও ফিরতে পারেননি। সন্তানকে ঘিরেই ছিল তার সব স্বপ্ন, সব সংগ্রাম। একমাত্র সন্তানকে হারানো ন্যায়বিচারই জীবনের শেষ প্রত্যাশা এ মায়ের।
স্বামীর সংসার ভেঙে যাওয়ার পর গর্ভে সন্তান নিয়েই বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। এরপর সেলাইয়ের কাজ, চাকরি এবং পরে বনশ্রীর একটি টেইলারিং ও কাপড়ের দোকান দিয়ে নিজের পরিশ্রমেই মানুষ করেন আশিকুলকে। বনশ্রীর নিবরাস মাদরাসার ইংলিশ ভার্সন ও আরবি কারিকুলামে নবম শ্রেণীতে পড়া সেই কিশোরই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল শুক্রবার। সকাল থেকে মা-ছেলে এক সাথেই ছিলেন। দুপুরে গ্যাস না থাকায় পরিচিত এক ব্যক্তির বাসায় খাবার খেয়ে নিজেদের বাসায় ফেরেন। এ সময় বনশ্রীর ‘জি’ ব্লক এলাকায় আন্দোলনের সেøাগান ও সংঘর্ষের শব্দ ছড়িয়ে পড়ে। আশিকুল কয়েকবার বাইরে যাওয়ার অনুমতি চাইলেও মা তাকে বারবার নিষেধ করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি ঘরে ফিরে এলেও আশিকুল বাইরে থেকে যায়।
এরপরই শুরু হয় গুলি। চারদিকে মানুষের দৌড়ঝাঁপ, আহতদের আর্তনাদ আর আতঙ্কের মধ্যে তিনি ভাবছিলেন, ছেলে হয়তো কোথাও নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আশপাশের গ্যারেজ, ভবন ও অলিগলি খুঁজেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরে এক প্রতিবেশী মোবাইল ফোনে একটি ছবি দেখান। ছবিতে মাথায় গুলিবিদ্ধ এক কিশোরের লাশ দেখে তিনি নিশ্চিত হন, সেটিই তার আশিকুল। পরে বিভিন্ন বাসার জানালা ও বারান্দা থেকে ধারণ করা ভিডিও দেখে জানতে পারেন পুরো ঘটনার বিবরণ। তিনি দেখেছেন ছেলের পড়ে থাকা জুতা, রক্তাক্ত সড়ক এবং শেষ মুহূর্তের নির্মম দৃশ্য। গুলিটি মাথার এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার দাদার বাড়িতে। সেখানেই দাফন করা হয় আশিকুলকে।
সরকারি অনুদানের প্রথম ধাপে তিনি ১০ লাখ টাকা পেলেও পরবর্তী ২০ লাখ টাকা আশিকুলের বাবার নামে বরাদ্দ হয়েছে বলে জানতে পেরেছেন। তার দাবি, জন্মের পর থেকে তিনিই একা সন্তানকে মানুষ করেছেন, লেখাপড়ার সব ব্যয় বহন করেছেন। জীবদ্দশায় আশিকুলের বাবা নিয়মিত খোঁজও নিতেন না।
আশিকুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৫ আগস্টের পর আদালতে মামলা করেন তার মা। ইতোমধ্যে তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। বিচার প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখলেও তিনি চান, যেন বিচার দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে না যায়।
আরিশা আফরোজ বলেন, আমি কারো কাছে হাত পাতিনি। দিন-রাত পরিশ্রম করে আমার সন্তানকে মানুষ করেছি। তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। আমি শুধু দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।



