আশিকুর রহমান
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো ইতিহাস গড়েছিল। প্রথম আফ্রিকান ও প্রথম আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল আটলাস লায়ন্সরা। অনেকেই সেই সাফল্যকে রূপকথার গল্প ভেবেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে মরক্কো প্রমাণ করতে চাইছে, সেটি কোনো একবারের বিস্ময় ছিল না বরং বিশ্ব ফুটবলের নতুন শক্তি হিসেবে তাদের উত্থানের সূচনা।
উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে মরক্কো আবারো নিজেদের সামর্থ্যরে পরিচয় দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিপক্ষে ১-১ ড্র করে আলোচনায় আসে তারা। এরপর হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গোল ব্যবধানে ব্রাজিলের পেছনে থেকে গ্রুপ সি-এর রানার্সআপ হিসেবে নকআউট পর্বে ওঠে।
রাউন্ড অব ৩২-এ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নাটকীয় এক ম্যাচে মরক্কো প্রায় বিদায়ের মুখে পড়েছিল। ম্যাচের শেষদিকে কডি গাকপোর গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ইনজুরি সময়ে ইসা দিয়পের গুরুত্বপূর্ণ হেডারে সমতা ফেরায় দলটি। পরে টাইব্রেকারে জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে মরক্কো।
এরপর তাদের সামনে স্বাগতিক কানাডার চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে সে বাধা অনায়াসেই টপকে গেছে আশরাফ হাকিমিরা। ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে জিতে প্রথম দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে তারা।
তবে ২০২২ সালের সেই দলের সাথে বর্তমান মরক্কোর বড় পার্থক্য রয়েছে। সাবেক অধিনায়ক রোমাঁ সাইস, তারকা মিডফিল্ডার হাকিম জিয়েশ এবং কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই এখন আর দলের অংশ নন। তাদের জায়গায় উঠে এসেছে নতুন প্রজন্ম।
লিলের তরুণ মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দি এবং ফরোয়ার্ড ইসমাইল সাইবারি ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের নজরে থাকা বুয়াদ্দিকে ভবিষ্যতের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্য দিকে পিএসভি আইন্দহোভেন থেকে জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেয়া সাইবারি আক্রমণভাগে নতুন শক্তি যোগ করেছেন।
মার্চে দায়িত্ব নেয়া কোচ মোহামেদ ওয়াহাবি দলকে নতুন ফুটবল দর্শন উপহার দিয়েছেন। রক্ষণাত্মক দৃঢ়তার পাশাপাশি এখন বল দখল, দ্রুত পাসিং এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে মরক্কো।
মরক্কোর ফুটবল ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। ১৯৭০ সালে প্রথম আফ্রিকান প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেয়া দেশগুলোর অন্যতম ছিল তারা। ১৯৮৬ সালে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পৌঁছায় মরক্কো। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেলেও দেশটির ফুটবল কাঠামো ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে গত এক দশকে যুব উন্নয়ন কর্মসূচি, আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ইউরোপে বেড়ে ওঠা মরোক্কান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল তাদের সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। এর ফলই দেখা গেছে ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মরক্কো ২০৩০ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ হতে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশটির ফুটবল অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগ চলছে। ফলে বর্তমান সাফল্যকে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল হিসেবে দেখছেন।
মরক্কোর সামনে কোয়ার্টার ফাইনালে এখন অপেক্ষা করছে শক্তিশালী ফ্রান্স। পথটি কঠিন হলেও মরক্কোর সাম্প্রতিক উত্থান দেখিয়ে দিয়েছে, তারা আর শুধু আফ্রিকার প্রতিনিধিই নয়; বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার মানচিত্র বদলে দেয়ার মতো এক উদীয়মান শক্তি। ২০২২ সালে তারা ইতিহাস লিখেছিল, আর ২০২৬ সালে সেই ইতিহাসকে আরো বড় উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে আটলাস লায়ন্সরা।



