জিয়ার স্মৃতিময় মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ভিত যেভাবে তৈরি হয়

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

খালেদা জিয়াকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়ি (যা সাধারণভাবে ‘ক্যান্টনমেন্ট হাউজ’ নামে পরিচিত) থেকে সরিয়ে দেয়ার ঘটনাটি ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সরকারের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত পদক্ষেপগুলোর একটি। এর ভিত তৈরি করে মঈন ইউ আহমদ ও তার সহযোগীরা। এটি শুধু একটি উচ্ছেদ ছিল না-বরং আইনি, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কৌশলের সমন্বয়ে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া।

বাড়ির বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা : আইনি ভিত্তি তৈরি

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়িটি মূলত সেনাবাহিনীর একটি আবাসন ছিল। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তার পরিবারকে ‘মানবিক বিবেচনায়’ এই বাড়িটি ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হয়। পরবর্তীতে এটি খালেদা জিয়ার প্রধান বাসভবনে পরিণত হয়।

২০০৭-২০০৮ (ওয়ান-ইলেভেন পর্যায়) সময়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে রাজনৈতিক ও আইনি চাপে ফেলা হয় এবং বাড়ির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে আর আগের প্রক্রিয়া সক্রিয়ভাবে এগিয়ে নেয়া হয়। এক পর্যায়ে সরকারিভাবে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেয়া হয়। আদালতের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে বাড়ি খালি করা হয়।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় দাবি করা হয়- এই বাড়িটি মূলত সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ ছিল; খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ‘বিশেষ সুবিধা’ হিসেবে এটি পেয়েছিলেন এবং তার স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর মানবিক কারণে এটি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। তখনকার সরকার যুক্তি দেয় যে- এই বরাদ্দ আইনসম্মত নয়, তাই বাতিলযোগ্য।

নোটিশ ও প্রশাসনিক চাপ : এরপর সরকারিভাবে বাড়ি ছাড়ার জন্য নোটিশ দেয়া হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাড়ি খালি করার নির্দেশ দেয়া হয়। একই সাথে বিভিন্ন প্রশাসনিক চ্যানেলে চাপ সৃষ্টি করা হয় যার লক্ষ্য ছিল ‘স্বেচ্ছায়’ বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা।

এরপর আদালতকে ব্যবহার করে বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সরকার পক্ষ থেকে বরাদ্দ বাতিলের পক্ষে আইনি লড়াই চালানো হয়।

এই প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের ওপর যে পরোক্ষ চাপ ছিল তা গোপন থাকেনি। ফলে এ নিয়ে তখন ব্যাপক বিতর্ক হয়।

নিরাপত্তা বলয় তৈরি ও চূড়ান্ত উচ্ছেদ : বাড়িকে কেন্দ্র করে এক পর্যায়ে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বাড়ির চারপাশে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় এবং রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকদের প্রবেশ সীমিত করা হয়। এর ফলে খালেদা জিয়া কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

যদিও উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি ওয়ান-ইলেভেন আমলে শুরু হয়, বাস্তবে উচ্ছেদ কার্যকর হয় ২০১০ সালে পরবর্তী সরকারের সময়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত থেকে বাড়ি খালি করে; অল্প সময়ের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়াকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। বিষয়টি দ্রুত সম্পন্ন করা হয় যাতে প্রতিরোধ গড়ে না ওঠে।

এই ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মিডিয়া বয়ান ও জনমত তৈরি করা হয়। বাড়িটিকে ‘অবৈধ দখল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা’র অংশ হিসেবে প্রচার করা হয়। এর মাধ্যমে উচ্ছেদকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করা হয়।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য : প্রতীক ভেঙে দেয়া

এই বাড়িটি শুধু একটি বাসস্থান ছিল না- এটি ছিল খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক মর্যাদার প্রতীক এবং জিয়াউর রহমানের স্মৃতির সাথে যুক্ত। তাই এটি সরিয়ে দেয়া মানে ছিল- একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও প্রতীককে দুর্বল করা।

মইনুল রোডের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের প্রক্রিয়াটি ছিল- আইনি যুক্তি তৈরি করা; প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি; নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ এবং জনমত প্রভাবিত করার চারটি স্তরের সমন্বিত প্রয়োগ। ওয়ান-ইলেভেন সরকার এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করে, যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে বাস্তবায়িত হয়।

এখন কী অবস্থায় বাড়িটি : খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের পর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের সেই বাড়িটির অবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্ন ও আগ্রহ রয়েছে। এটি এখন আর ব্যক্তিগত বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয় না; বরং রাষ্ট্রীয়/সামরিক নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।

মইনুল রোডের বাড়ি উচ্ছেদের সময় যে কথা বলা হয়েছিল এর জমিতে পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে নিহতদের পরিবারের বাসস্থান নির্মাণ করা হবে। পরে তা বাস্তবে রূপ পায়নি। এখানে কোনো ফ্ল্যাট প্রকল্প হয়নি। কোনো শহীদ পরিবার সেখানে বসবাস করছে না। জায়গাটি এখনো রাষ্ট্র/সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকার চাইলে এটিকে আগের মতো জিয়া পরিবারের বাসস্থান অথবা জিয়া স্মৃতি মিউজিয়াম তৈরি করতে পারে। তবে এর আগে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন।