শিল্পবর্জ্য, দখল ও নাব্য সঙ্কটে বিপর্যস্ত পুরনো ব্রহ্মপুত্র

ড্রেজিংয়ের কার্যকারিতা ও নদী রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের দাবি

Printed Edition

মো: সেলিম মিয়া মাধবদী (নরসিংদী)

‘প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার’খ্যাত নরসিংদীর মাধবদী ও শেখেরচর (বাবুরহাট) এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহাসিক পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ শিল্পবর্জ্য, দখল, নাব্য সঙ্কট এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোর চাপে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একসময় ঢাকার হাতিরঝিলের আদলে নদীটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও নাব্য ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

সরেজমিন দেখা যায়, নদীর দুই তীরে বিভিন্ন স্থানে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সঙ্কুচিত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে পড়ায় পানির রঙ কালচে হয়ে গেছে এবং দুর্গন্ধে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা দুর্ভোগে পড়ছেন। তাদের ভাষ্য, এ কারণে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

ড্রেজিং প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, খননের নামে নদীর তলদেশ থেকে উত্তোলিত মাটি ও বালু বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হয়েছে, তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নদী দখলকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নদীর জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা কিছু দোকান ও স্থাপনা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হলেও এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। স্থানীয়দের আরেকটি অভিযোগ, মাধবদী নতুন বাসস্ট্যান্ড-আনন্দী মোড়-গরুহাট সড়কে পুরনো সেতু অপসারণ না করে তার ওপর নতুন সেতু নির্মাণ করায় নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বর্জ্য ও পলি জমে নদীর পরিবেশ আরো অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।

মাধবদী প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি এমদাদুল ইসলাম খোকন বলেন, নদী খননের পর যথাযথ তদারকি না থাকায় পুনরায় ভরাট ও দখল হচ্ছে। তিনি দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান এবং কার্যকর পুনঃখননের দাবি জানান।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আজিজুল হক বলেন, নদীর পানি দূষণমুক্ত থাকলে কৃষকরা সহজেই সেচের কাজে তা ব্যবহার করতে পারতেন। এতে উৎপাদন ব্যয় কমার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনও বাড়ত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার কয়েকটি ডাইং ও শিল্পকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও হাড়িধোয়া নদীতে ফেলায় দূষণ বাড়ছে। তবে অভিযুক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নরসিংদী পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তা বদরুল হুদা বলেন, শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধে তারা নিয়মিত চেষ্টা করছেন। তবে আইন বাস্তবায়নে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশগত বিধিমালা মেনে চলার পাশাপাশি বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) কার্যকরভাবে পরিচালনার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

স্থানীয় সচেতন মহল নদী দখলমুক্ত করা, শিল্পকারখানায় ইটিপির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা, ড্রেজিং কার্যক্রমের স্বচ্ছ তদন্ত এবং নদী পুনরুদ্ধারে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ব্রহ্মপুত্রের পরিবেশগত সঙ্কট আরো গভীর হবে এবং জনজীবন, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।