শাহ আলম নূর ফ্রান্স থেকে ফিরে
ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য কঠোর নীতির অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ উৎস দেশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশী নাগরিকদের অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির আওতায় আসবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবেদন গ্রহণের সম্ভাবনা আরও কমবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তারা বলছেন, বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করে ইইউর প্রকাশিত নতুন তালিকা ইউরোপে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রত্যাশী বাংলাদেশীদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের অ্যাসাইলাম আবেদন গ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। নতুন এই উদ্যোগ কার্যকর হলে আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ আরো সীমিত হতে পারে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশ্লেষকরা।
গত ১৬ এপ্রিল ইউরোপীয় কমিশন বাংলাদেশসহ সাতটি দেশকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদনকে প্রাথমিকভাবে ভিত্তিহীন বলে বিবেচনা করা হয়, সেসব আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং প্রত্যাখ্যাত আবেদনকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপজুড়ে অভিবাসন প্রশ্নে রাজনৈতিক পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। গত এক দশকে ইউরোপের বহু দেশে অভিবাসনবিরোধী এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে এসব দলের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে মূলধারার সরকারগুলোও অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া, সুইডেন ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার অভিবাসন আইন কঠোর করেছে। নতুন আইনে পরিবার পুনর্মিলন, নাগরিকত্ব অর্জন এবং সামাজিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। একইভাবে পর্তুগাল, যা দীর্ঘ দিন অভিবাসীদের জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ছিল, এখন কাজের ভিসা ছাড়া বিদেশী কর্মীদের দেশে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা বলছেন, এমন পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তা নিয়ে জনমতের পরিবর্তন। ইউরোপীয় রাজনীতিতে অভিবাসন এখন অন্যতম আলোচিত ইস্যু। বিভিন্ন দেশের সরকার মনে করছে, আশ্রয় ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ করতে না পারলে অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা আরো কমে যাবে।
বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো জটিল। ইউরোপীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশী নাগরিকদের অ্যাসাইলাম আবেদনের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক কারণকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন অনুযায়ী অর্থনৈতিক দুরবস্থা বা উন্নত জীবনের আকাক্সক্ষা রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার বৈধ ভিত্তি নয়।
১৯৫১ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, বর্ণ বা বিশেষ কোনো সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার কারণে নিপীড়নের শিকার হন কিংবা তার জীবন ও স্বাধীনতা ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতে পারেন। কেবলমাত্র কর্মসংস্থান বা অর্থনৈতিক সুযোগের অভাবের কারণে কাউকে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক দুরবস্থা বা উন্নত জীবনের আকাক্সক্ষার কারণে ইউরোপে বাংলাদেশীদের অনেক আবেদন শুরুতেই দুর্বল হিসেবে বিবেচিত হয়। বিভিন্ন দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীরা পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেন না। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া নথি ব্যবহারের অভিযোগও উঠে এসেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশী আবেদনকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফ্রান্সে অবস্থানরত বাংলাদেশী অভিবাসী নুরুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, একসময় জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স কিংবা নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশীদের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন প্রতিটি আবেদন আরো গভীরভাবে যাচাই করছে এবং প্রত্যাখ্যানের হারও বাড়ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে ইউরোপীয় কমিশনের যুক্তি হচ্ছে, দেশটিতে চলমান যুদ্ধ নেই, রাষ্ট্রীয় কাঠামো কার্যকর রয়েছে এবং সাধারণভাবে নাগরিকদের জন্য ব্যাপক ও পদ্ধতিগত নির্যাতনের পরিস্থিতি বিদ্যমান নয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে আসা অধিকাংশ আবেদনকে তারা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া রাজনৈতিক আশ্রয়ের উপযুক্ত মনে করছে না।
তিনি বলেন, এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে প্রবেশ করে পরে অ্যাসাইলামের মাধ্যমে বৈধতা পাওয়ার যে প্রবণতা দীর্ঘ দিন ধরে চালু ছিল, তা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেনে পৌঁছে আশ্রয়ের আবেদন করার যে পথ অনেক বাংলাদেশী অনুসরণ করতেন, সেটি আগের মতো কার্যকর নাও থাকতে পারে।
ফ্রান্সে অবস্থানরত বাংলাদেশী অভিবাসন শাহ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ইউরোপের শ্রমবাজারে এখনো বিদেশী কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। কৃষি, নির্মাণ, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিক সঙ্কট বিদ্যমান। তবে এসব চাহিদা পূরণে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন অনিয়মিত অভিবাসনের পরিবর্তে দক্ষ ও বৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করছে। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ভাষাজ্ঞান এবং বৈধ কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে ইউরোপে যাওয়ার সুযোগ বাড়লেও রাজনৈতিক আশ্রয়কে বৈধতার শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ কমে আসবে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে দক্ষ কর্মী, শিক্ষার্থী এবং মৌসুমি শ্রমিকদের জন্য পৃথক ভিসা ব্যবস্থা চালু করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা এবং বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপমুখী হচ্ছেন। কিন্তু তাদের একটি অংশ দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে অনিয়মিত পথে যাত্রা করেন। এতে একদিকে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, অন্যদিকে জীবনঝুঁকিও তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইইউর ‘নিরাপদ দেশ’ তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইউরোপের পরিবর্তিত অভিবাসন নীতির প্রতিফলন। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশীদের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ আরো সীমিত হতে পারে। একই সাথে এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে ইউরোপ এখন অনিয়মিত অভিবাসনের পরিবর্তে দক্ষতা ও বৈধতার ভিত্তিতে অভিবাসনকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। ফলে ভবিষ্যতে ইউরোপে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশীদের জন্য নতুন বাস্তবতা হবে অ্যাসাইলামের ওপর নির্ভরতা নয়, বরং দক্ষতা, বৈধতা এবং পরিকল্পিত অভিবাসন।



