স্বজনপ্রীতির বৃত্তে বিএনপির তৃণমূল : ত্যাগী বনাম নবাগতদের দ্বন্দ্বে বাড়ছে ক্ষোভ

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

বাংলাদেশের তৃণমূল রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র ও আত্মীয়করণের প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই একটি আলোচিত বিষয়। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বর্তমান প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিও এই প্রবণতার বাইরে নেই। এর ফলে দলের দুঃসময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকার করা পরীক্ষিত কর্মীরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। দীর্ঘদিনের অনুগত ও সক্রিয় কর্মীদের মূল্যায়ন না করে সুবিধাবাদী ও নবাগতদের প্রাধান্য দেয়ার কারণে তৃণমূল থেকে শুরু করে মহানগর এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তীব্র অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। ফলে মূল্যায়ন সঙ্কটকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।

সূূত্র মতে, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থেকেও আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা এবং নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পথচলা অব্যাহত রেখেছে বিএনপি। এই দীর্ঘ সময়ে দলটির অসংখ্য নেতাকর্মী জেল খেটেছেন, আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলের অভ্যন্তরে এক নতুন সাংগঠনিক সঙ্কট প্রকট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ‘ত্যাগী বনাম নবাগতদের’ দ্বন্দ্বের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিগুলোকে ঘিরে।

দিবসটি পালনকালে অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী নিজেদের উপেক্ষিত মনে করেছেন। তাদের দাবি, যারা দীর্ঘ সময় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং দলের জন্য ব্যক্তিগত জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কার্যক্রমের বাইরে রাখা হচ্ছে। এমনকি ছাত্রদল ও যুবদলের সাম্প্রতিক কমিটিগুলোতেও তাদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী নেতাদের পরিবার, আত্মীয় ও নিজস্ব বলয়ের লোকদের স্থান দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক ছাত্রদল নেতা রাকিবুর রহমানের ভাষ্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছাত্রদল, ওয়ার্ড বিএনপি এবং থানা পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে একাধিকবার গ্রেফতার ও কারাভোগও করেছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তিনি মনে করেন, দলের ভেতরে এখন এমন অনেক ব্যক্তি প্রভাবশালী অবস্থানে চলে এসেছেন, যাদের দলের কঠিন সময়ে রাজপথে দেখা যায়নি।

কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আরশাদও একই ধরনের অভিযোগ করে বলেন, “দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও অনেক ত্যাগী নেতাকে এখন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। নামমাত্র পদ থাকলেও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে অনুগত কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।”

অনুরূপ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান। আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে একাধিক মামলার আসামি হয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করা এই নেতা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে গঠিত নতুন সাংগঠনিক কাঠামোয় তিনি এবং তার মতো অনেক পুরনো কর্মী স্থান পাননি। তার মতে, সঙ্কটের সময়ে যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন করা না হলে ভবিষ্যতে দলে তীব্র নেতৃত্ব-সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে।

ঢাকা-১৫ আসনের রাজনীতিতে সক্রিয় একাধিক নেতাকর্মী জানান, দলের সুসময় আসার সাথে সাথে এমন অনেক ব্যক্তি সামনে চলে এসেছেন, যারা অতীতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। অন্য দিকে মাঠ কাঁপানো নেতারা এখন সাংগঠনিকভাবে কোণঠাসা।

সাবেক মহানগর নেতা আহসান উল্লাহ চৌধুরী হাসানের মতে, বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে বর্তমানে নতুন ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্দোলনের কঠিন সময়ে যাদের খুঁজে পাওয়া যেত না, আজ তারাই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সামনের সারিতে অবস্থান করছেন।

যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান মোল্লা বলেন, “দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, যিনি মিছিলের শেষভাগেও ছিলেন, তাকেও মূল্যায়ন করা হবে। আমরা অসুস্থ শরীর নিয়ে রাজপথে থেকেছি, ঈদে বাড়ি যেতে পারিনি, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছি; অথচ আজ আমাদের জায়গা কোথাও হচ্ছে না।” সম্প্রতি ঘোষিত বিএনপির দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসংগঠনের কমিটির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সেখানে বিতর্কিত, নিজস্ব বলয় ও বহিরাগতদের স্থান দেয়া হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে ত্যাগী কর্মীরা দলীয় কর্মসূচিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা যেকোনো বড় দলের জন্য সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আন্দোলন পরিচালনা, মামলা মোকাবেলা ও কারাবন্দী নেতাকর্মীদের সহায়তা দিতে গিয়ে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এই বাস্তবতায় আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা অনেক সময় দলের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। আর এখানেই সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর উত্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ত্যাগ ও সাংগঠনিক দক্ষতার চেয়ে অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতা বলেছেন, কিছু প্রভাবশালী বলয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পরীক্ষিত ও স্পষ্টভাষীদের আড়ালে রেখে অনুগতদের সামনে নিয়ে আসছে। প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলাতেই এখন ত্যাগী ও নবাগতদের মধ্যে এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা চলছে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নিচ্ছে। এটি দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

উদাহরণ হিসেবে তারা সম্প্রতি ঘোষিত ছাত্রদল ও যুবদলের কমিটির কথা উল্লেখ করে বলেন, এই কমিটির অনেকেরই গত দেড় দশকের আন্দোলনে রাজপথে কোনো ভূমিকা ছিল না। পরিবার ও আত্মীয় কোটার পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যার ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন ক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ অনেকটাই কমে আসবে এবং সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে প্রকৃত ও পরীক্ষিত রাজনীতিকরা অবমূল্যায়নের শিকার হন। দীর্ঘদিন রাজনীতি করার পর একটি পর্যায়ে নেতাদের পারিবারিক উত্তরসূরিদের জায়গা দিতে গিয়ে ত্যাগীদের দূরে সরিয়ে দেয়া হয়। নবাগতরাই তখন মন্ত্রী-এমপির প্রটোকল পাওয়ার সুযোগ পান। আর ত্যাগী নেতাদের সান্ত¡না পুরস্কার হিসেবে দলীয় কোনো পদ দিয়ে খুশি করার চেষ্টা করা হয়, অনেক সময় সেটিও জোটে না। এর ফলে ত্যাগী রাজনীতিকদের মধ্যে একধরনের বিমুখতা তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য তৃণমূল থেকেই প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে।”

দলটিতে ‘হাইব্রিড’ বা সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশের বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, “হাইব্রিড নেতাদের বিষয়ে দল অত্যন্ত সতর্ক রয়েছে। বিএনপির দুর্দিনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, পরিশ্রম করেছেন দল অবশ্যই তাদের মূল্যায়ন করবে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সময়ে আশ্বস্ত করেছেন। ফলে যাদের বিরুদ্ধেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠছে, দল তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে।”