খাদেমুল বাবুল জামালপুর
জামালপুর শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ এখন কার্যত পানিশূন্য ও বদ্ধ জলাধারে পরিণত হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্থাপনার সামনে থাকা এই নদ বর্তমানে মশার প্রজনন কেন্দ্র ও বর্জ্যরে ভাগাড়ে রূপ নিয়েছে। নদীর এই করুণ অবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা। একই সাথে ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা চর দখল করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং সেই প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের জন্য সরকারি অর্থে সেতু নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়, পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ২৫০ শয্যার জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল, সার্কিট হাউজ, সিভিল সার্জনের বাসভবনসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলো। অথচ এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সামনে থাকা ব্রহ্মপুত্র নদ এখন আগাছায় ভরা, দুর্গন্ধযুক্ত বদ্ধ খালে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০-এর দশকে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের মুখে পড়ে জামালপুর শহরের বহু সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। নদীশাসনের পরিবর্তে শহরতলির গুয়াবাড়ি এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের মোহনায় একটি বাঁধ নির্মাণ করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়া হয়। এতে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এক সময়কার খরস্রোতা এই নদ এখন মৃতপ্রায় বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে শহরের বিভিন্ন ড্রেনের ময়লা পানি এসে জমছে এই নদে। কোথাও কোথাও মৃত প্রাণীর দেহ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদীর তলদেশজুড়ে জন্মেছে আগাছা ও জলজ উদ্ভিদ। এতে পুরো এলাকাজুড়ে মশার উপদ্রব কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এর মধ্যেই নদীর একটি অংশের ওপর দিয়ে একটি দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রায় ৬০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে প্রথমে সাত কোটি ২২ লাখ ৯১ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও পরে আট কোটি ৪২ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় চুক্তি করা হয়। ‘চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালে সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রহ্মপুত্র নদের চর দখল করে সেখানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম জুলাই বিপ্লবের পর পরিবর্তন করে ‘ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়’ করা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, মূলত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের সুবিধার জন্যই সরকারি অর্থায়নে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। অথচ প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে ২০০ মানুষও পারাপার করে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হলেও তার নিচ দিয়ে প্রবাহিত নদ পরিণত হয়েছে শহরের বর্জ্যরে ভাগাড়ে। পানিপ্রবাহ না থাকায় আগাছা জন্মে এটি এখন মশার প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
জামালপুর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, শহরের পরিবেশ রক্ষায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদটি দ্রুত পরিষ্কার ও খননের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। আগাছা অপসারণ ও খনন করা হলে প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলাধারের মাধ্যমে স্বচ্ছ পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তিনি বলেন, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রকে মূল স্রোতধারার সাথে সংযুক্ত করা গেলে এটি জামালপুর শহরের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে এবং শহরটি একটি পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত হতে পারে। এই পরিবেশ কর্মী অবশ্য নদের চর দখল করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও বিরোধিতা করেন।
এদিকে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মো: মনিরুজ্জামান বলেন, বদ্ধ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদকে আবার মূল স্রোতধারার সাথে যুক্ত করা গেলে শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


