তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের বিপরীতে প্রবীণদের হিসাব-নিকাশ

ঢাকা-১১ আসন

মাঘের হিমেল হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ, যার আঁচ বেশ ভালোভাবেই লেগেছে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-১১ আসনে। বাড্ডা, রামপুরা ও ভাটারা নিয়ে গঠিত জনবহুল এই আসনে এখন মূল লড়াইয়ের আভাস মিলছে অভিজ্ঞ রাজনীতিক বনাম নবীন নেতৃত্বের মধ্যে। এই আসনে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলাম লড়ছেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও দলটির মাইক্রোক্রেডিট বিষয়ক সম্পাদক ডা. এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে।

হারুন ইসলাম
Printed Edition

মাঘের হিমেল হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ, যার আঁচ বেশ ভালোভাবেই লেগেছে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-১১ আসনে। বাড্ডা, রামপুরা ও ভাটারা নিয়ে গঠিত জনবহুল এই আসনে এখন মূল লড়াইয়ের আভাস মিলছে অভিজ্ঞ রাজনীতিক বনাম নবীন নেতৃত্বের মধ্যে। এই আসনে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলাম লড়ছেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও দলটির মাইক্রোক্রেডিট বিষয়ক সম্পাদক ডা. এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে। গত কয়েক দিনের মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, এই আসনে ভোটের সমীকরণ বেশ জটিল। একদিকে তরুণ প্রজন্মের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, অন্য দিকে স্থানীয় প্রবীণ ভোটারদের অভিজ্ঞতালব্ধ সন্দেহ ও হতাশা- এই দুই মেরুতে দুলছে ঢাকা-১১ এর নির্বাচনী ভাগ্য।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বিএনপির প্রার্থী ডা. এম এ কাইয়ুমের পোস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি- কোথাও ফাঁকা নেই। কিন্তু সচেতন ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, জরাজীর্ণ পুরনো রাজনীতির ধারক ডা: কাইয়ুমের ‘দেয়াল দখল’ বা টাকার জোরে চালানো প্রচারণাকে সাধারণ মানুষ প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে। বিপরীতে নাহিদ ইসলামের প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। কোনো সংগঠিত জাঁকজমক ছাড়াই সাধারণ শিক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত জনতা এবং খেটে খাওয়া মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে তার প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, বিএনপির মিছিলে লোকসমাগম হলেও তাতে প্রাণের ছোঁয়া নেই, কিন্তু এনসিপির মিছিলে প্রতিটি মানুষ নিজের তাগিদে, পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে রাস্তায় নামছেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনা দেখে মনে হচ্ছে, তারাই এবার ভোটের মাঠের মূল ‘গেম চেঞ্জার’।

একটা সময় মনে করা হতো, রাজনীতিতে প্রবীণদের অভিজ্ঞতাই শেষ কথা। কিন্তু ঢাকা-১১ আসনে সেই সমীকরণ উল্টে দিচ্ছে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্ম। ভাটারার রাস্তায় নাহিদ ইসলামকে ঘিরে তরুণদের যে উন্মাদনা দেখা গেছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। মিছিলের ভিড় ঠেলে তরুণরা যখন নাহিদ ইসলামের সাথে সেলফি তুলছেন বা হাত মেলাচ্ছেন, তখন তাদের চোখেমুখে ছিল বিজয়ের দীপ্তি। তরুণদের এই জাগরণ ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলছে পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের ওপরও। জামায়াত বা অন্য দলের সাথে বৈঠকের গুজব ছড়িয়ে প্রতিপক্ষ বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করলেও, সাধারণ মানুষ বিষয়টিকে নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও সবাইকে নিয়ে চলার উদার মানসিকতা হিসেবেই দেখছেন।

ঢাকা-১১ আসনটি মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আবাসস্থল। এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রাজনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট। তারা এখন মুক্তি চাইছেন, চাইছেন এমন একজন প্রতিনিধি যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে তাদের প্রকৃত সমস্যার কথা বলবেন। নাহিদ ইসলাম সেই আকাক্সক্ষারই মূর্ত প্রতীক বলছেন সেখানকার তরুণ ভোটাররা। বিশ্লেষকরা বলছেন, নাহিদ ইসলাম বড় কোনো শোডাউন বা গৎবাঁধা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না; বরং ছোট ছোট পথসভা ও ঘরোয়া উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সরাসরি ভোটারদের হৃদয়ে জায়গা করে নিচ্ছেন। এই সাদামাটা প্রচারশৈলীই তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ততই বাড়ছে। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে ঢাকা-১১ আসন থেকে যে বার্তা দেয়া হবে, তা পুরো বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

এ দিকে এলাকার রাজনৈতিক নাড়ি-নক্ষত্র বেশ ভালোই বোঝেন স্থানীয় ব্যবসায়ী আশফাক মোমেন (ছদ্মনাম)। প্রচারণায় নাহিদ ইসলামের জটলা দেখিয়ে তিনি অনেকটা নিশ্চিত করেই বললেন, ভিড় দেখে ভোট বিচার করবেন না। এখানে যারা নাহিদের স্লোগান দিচ্ছে, খোঁজ নিলে দেখবেন এদের অর্ধেকই শেষ পর্যন্ত ধানের শীষে ভোট দেবে। ডা: কাইয়ুমের একটা শক্ত ভিত্তি এখানে আগে থেকেই আছে। আবেগ দিয়ে তো আর রাজনীতি চলে না, সংগঠন লাগে।

প্রবীণদের এই মনোভাবের পেছনে কাজ করছে বিএনপির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি। দৃশ্যমান প্রচারণায় বিএনপি যে এনসিপির চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে এবং তাদের মিছিলে কোনো বড় ধরনের প্রচেষ্টা ছাড়াই লোকসমাগম বেশি হচ্ছে, তা একনজর দেখলেই বোঝা যায়।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখা গেল তরুণ ভোটারদের মাঝে। প্রবীণরা যেখানে হিসাব-নিকাশ কষছেন, তরুণরা সেখানে আবেগে ভাসছেন। নাহিদ ইসলাম যখন ভাটারার অলিগলিতে ঢুকছিলেন, তখন রাস্তার দু’পাশ থেকে তরুণরা হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছিলেন। মিছিলের এক ফাঁকে দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য; বেশ কয়েকজন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভিড় ঠেলে প্রার্থীর কাছে গিয়ে সেলফি তোলার আবদার করছেন। নাহিদও হাসিমুখে তাদের আবদার মেটাচ্ছেন। এই তরুণদের কাছে নাহিদ ইসলাম কেবল একজন প্রার্থী নন, বরং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ‘আইকন’। রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহিম জানালেন, গতানুগতিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন এবং নাহিদকে নিজেদের প্রজন্মের প্রতিনিধি মনে করেন। আরেক তরুণ সমর্থক নিজেকে নাহিদের ‘একনিষ্ঠ ভক্ত’ দাবি করে বলেন, দেয়াল বিএনপির দখলে থাকলেও সোশ্যাল মিডিয়া আর তরুণদের মন তাদের দখলেই আছে।

ভাটারা এলাকার বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন বলেন, আমরা গতানুগতিক ‘পেশিশক্তি’ আর ‘পোস্টারসর্বস্ব’ রাজনীতি দেখে বড় হয়েছি। কিন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে যে, পরিবর্তনের জন্য কোটি টাকা লাগে না, সাহস লাগে। নাহিদ ভাই সেই সাহসের নাম। রাস্তায় ওনার পোস্টার কম থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের মতো হাজারো তরুণের প্রোফাইল পিকচারে তো উনিই আছেন। আমরা এবার দেয়াল দেখে নয়, বিবেক দেখে ভোট দেবো।

প্রচারণায় তরুণদের অংশগ্রহণ ও প্রবীণদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনসিপির আহ্বায়ক ও প্রার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, দেখুন, আমরা কোনো প্রথাগত ক্ষমতার পালাবদলের জন্য নির্বাচনে আসিনি। আমাদের লড়াইটা পুরনো ও পচা রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে। চব্বিশের অভ্যুত্থানে এই দেশের ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে যে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন দেখেছিল, আমরা সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। আমাদের রাজনীতি কাউকে প্রতিপক্ষ বানানো নয়, বরং রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেয়া। কেউ কেউ আমাকে নির্দিষ্ট কোনো দলের ট্যাগ দেয়ার চেষ্টা করছেন। আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই- আমার জোট বা বৈঠক কোনো দলের সাথে নয়, আমার জোট এ দেশের শোষিত মানুষের সাথে।

ঢাকা-১১ আসনটি মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত। এখানে যেমন অভিজাত আবাসন আছে, তেমনি আছে ঘনবসতিপূর্ণ শ্রমিক এলাকা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আসনের ফলাফল নির্ভর করবে ‘সাইলেন্ট ভোটার’ বা নীরব জনগোষ্ঠীর ওপর। নাহিদ ইসলামের প্রচারণা কৌশল গতানুগতিক ধারার বাইরে; তিনি বড় শোডাউনের চেয়ে ছোট পথসভা এবং অনলাইন প্রচারণায় জোর দিচ্ছেন বেশি। তবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনো সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, পরিস্থিতি ততই বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে। তরুণদের এই উচ্ছ্বাস ব্যালট বাক্সে ঝড় তুলতে পারবে নাকি প্রবীণদের অভিজ্ঞতাই শেষ হাসি হাসবে, তা সময়ই বলে দেবে।