মনিরুল ইসলাম রোহান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতন ঘটে আওয়ামী লীগের। মতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়ার পরও নানাভাবে দেশের রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পতিত দলটি। কিন্তু জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত বর্বর হত্যাকাইেমবর মতো গুরুতর অপরাধের পরও গত দেড় বছরে দলটির কোনো স্তরের নেতৃত্বের মধ্যেই বিন্দুমাত্র অনুশোচনার প্রকাশ দেখা যায়নি। বরং ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিার্থী, নারী-পুরুষ ও শিশুহত্যার দায় এড়াতে পুলিশের নিহত হওয়ার ঘটনাকে বারবার সামনে এনে শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের অবস্থানকে ‘জাস্টিফাই’ করার চেষ্টা করেছে।
এ দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণ-অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডার সংগঠন ও দলগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভেদ ও বিভক্তির কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারো আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে পারে- এমন গুঞ্জনের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরছে আওয়ামী লীগ’- এমন বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে- ফেরার কৌশলটি কী, কারা পতিত দলটিকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনে সহায়তা করতে পারে এবং আদৌ তারা ফিরতে সম হবে কি না?
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ) আওয়ামী লীগের রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার প-েবিপে মতামত তুলে ধরে একটি জরিপ পরিচালনা করে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ওই জরিপে আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতিতে আবার প্রাসঙ্গিক করার একটি ন্যারেটিভ দৃশ্যমান হয়। জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ আবার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে দেখতে চায় বলে দাবি করা হয়। এর মধ্যে ১৮-৩৪ বছর বয়সী তরুণ উত্তরদাতাদের ৫৩.৯ শতাংশ এবং ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের ৬০.৩ শতাংশ আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পে মত দেন। তবে নিষিদ্ধ রাখার পওে উল্লেখযোগ্য মতামত উঠে আসে। মোট উত্তরদাতার ৩৫.৩ শতাংশ মনে করেন, আওয়ামী লীগ আর রাজনীতিতে ফিরে আসা উচিত নয়। এর মধ্যে ১৮-৩৪ বছর বয়সীদের ৩৯.৯ শতাংশ এবং ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের ৩০.৮ শতাংশের অভিমত-অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রায় আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ রাখা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, নিজেদের ভুল সিদ্ধান্ত ও দমননীতির কারণে আওয়ামী লীগ তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সঙ্কটময় সময় পার করছে। পতনের মাত্র চার মাসের মাথায় বিদেশি গণমাধ্যমের ওই জরিপে দলটিকে প্রাসঙ্গিক করে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। অপরাধের মাত্রা এতটাই গুরুতর যে দীর্ঘ দেড় বছরেও পতিত দলটির প্রতি দেশের মানুষের মন গলেনি। তথ্যানুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন।
এমন বাস্তবতার মধ্যেও কিছু সুশীল নামধারী আওয়ামী বুদ্ধিজীবী মাঝেমধ্যে টেলিভিশন টকশোতে ভিন্ন ন্যারেটিভ উপস্থাপন করে দলটিকে আবার প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি পতিত দলের সমর্থকগোষ্ঠীর একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে- ‘শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ আবারো বাংলাদেশে ফিরছে, রাজনীতিতে ফিরছে’।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে দেয়া এক সাাৎকারে মতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় দেশের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যাশার কথা জানান এবং শেখ হাসিনার রাজনীতি থেকে অবসরের ইঙ্গিত দেন। সাাৎকারে এক প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘দেখুন, এটা কোনো পরিকল্পিত পরিস্থিতি ছিল না। হঠাৎ করেই সব ঘটে যায়। ভারত ছিল তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। আমার মা আসলে দেশে ফিরতে চান। তিনি অবসর নিতে চান। বিদেশে থাকতে চান না।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে হয়তো সম্ভব না, তবে একসময় সম্ভব হবে।’ সাাৎকারের শেষ প্রশ্নে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আছে। আওয়ামী লীগ কোথাও যাচ্ছে না। এটি দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহত্তম দল। আমাদের ভোট শেয়ার ৪০-৫০ শতাংশ। এই ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ কি হঠাৎ সমর্থন বন্ধ করে দেবে? ১৭ কোটি মানুষের দেশে ৬-৭ কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের সমর্থক।’ হাসিনা যুগের সমাপ্তি হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘সম্ভবত, হ্যাঁ।’
সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা যদি আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে অবসর নেন, তাহলে দলটির নেতৃত্ব কে দেবেন- এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। পতনের পরপরই ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ ধারণা নিয়ে দলটির একটি অংশ সোচ্চার হয়েছিল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়ে গুঞ্জনও তৈরি হয়। তবে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার অনাগ্রহের কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, পশ্চিমা বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ শেখ হাসিনার পরিবর্তে সজীব ওয়াজেদ জয়কে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে দেখতে আগ্রহী। জয়ের বসবাস, জীবনাচরণ ও রাজনৈতিক ভাষ্য পশ্চিমা ধাঁচের হওয়ায় তিনি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের বন্ধুপ্রতিম একটি বিশেষ রাষ্ট্রের মনোযোগ শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের দিকে বলেও আলোচনা রয়েছে। প্রতিবেশী ওই দেশের স্বার্থ সংরণ ও যোগাযোগ রায় পুতুলের সাথেও মায়ের মতোই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা।
এ দিকে প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং পতিত আওয়ামী লীগের সহযোগী শক্তি হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির ভূমিকার কথাও আলোচনায় এসেছে। জাতীয় পার্টি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই দলটির মাধ্যমেই ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পথ তৈরি হতে পারে।
বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুমও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত করার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ পশ্চিমা বিশ্বের ব্যাপক চাপ রয়েছে। আমার ধারণা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই চাপ উপো করতে পারছে না। বরং সরকারের নমনীয় নীতির সুযোগ নিয়ে গণতন্ত্র ধ্বংসকারী ফ্যাসিবাদের দোসররা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। বিশেষ করে জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণই ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি হিসেবে দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ যদি রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়, তাহলে জাতীয় পার্টির ওপর ভর করেই তা ঘটবে।’
তবে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ইকতেদার আহমেদ বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন। তিনি জুলাই আন্দোলনে গণহত্যার সাথে জড়িত ব্যক্তি ও নেতাকর্মীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান। একই সাথে তিনি বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অপরাধ করেনি- দলের সবাই অপরাধী নয়। তাই তাদের রাজনীতি করার সুযোগ থাকা উচিত। তবে দলের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা যদি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে তারও বিচার হওয়া জরুরি।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মওলা রনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের যেসব নেতার বিরুদ্ধে ব্যাপক জন-অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং যারা অন্যায় ও অপকর্মের সাথে জড়িত, তাদের বিচার ও শাস্তির আওতায় আনতেই হবে। শুদ্ধ রাজনীতির স্বার্থে তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া উচিত নয়। একই সাথে তিনি মত দেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া এবং তাদের পার্টি অফিস খুলে দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তাতে ‘ইনকুসিভ নির্বাচন’ ধারণাটি অর্থবহ হবে এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।



