অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition
অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ
অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশের জন্য আবেগ, প্রত্যাশা আর লড়াইয়ের গল্প। অথচ সেই বিশ্বমঞ্চেই এবার বাংলাদেশের উপস্থিতি অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই প্রথমবারের মতো এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। যেখানে বিশ্বকাপে খেলা হবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে মাত্র ২৪ ঘণ্টার সিদ্ধান্তের ওপর।

গতকাল আইসিসির গুরুত্বপূর্ণ সভায় বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপে ভারত গিয়ে খেলতে না চাইলে, বাংলাদেশের জায়গায় বদলি দল হিসেবে স্কটল্যান্ডকে নেয়া হবে। এখানেই শেষ নয়। আইসিসি পরিষ্কার করে দিয়েছে, সূচি পরিবর্তন হবে না, গ্রুপ বদল হবে না, ভেন্যু পরিবর্তন হবে না, কোনো ছাড় দেয়া হবে না। অর্থাৎ, বাংলাদেশ থাকুক বা না থাকুক, বিশ্বকাপ চলবে পূর্বনির্ধারিত কাঠামোতেই।

এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কার্যত একটি বার্তা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের আপত্তি, উদ্বেগ কিংবা যুক্তি আইসিসির বিবেচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে না। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেও কোনো সমাধান আদায় করতে পারেনি বিসিবি। বরং চাপ আরও বেড়েছে। ‘হয় ভারতে খেলুন, না হলে বাদ পড়ুন’ এই দ্বিমুখী শর্তই এখন বাংলাদেশের সামনে।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে, এই অনড় অবস্থানের পেছনে কি শুধুই আইসিসির নিয়ম, নাকি ভারতের প্রভাব? ক্রিকেট রাজনীতির বাস্তবতা নতুন কিছু নয়। বড় শক্তির দেশগুলোর সিদ্ধান্তই যে শেষ কথা হয়ে ওঠে, তার প্রমাণ বারবার মিলেছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশও। ভারতের মাঠে খেলা নিয়ে অনীহার পেছনে যে শুধু আবেগ নয়, বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অথচ সেই উদ্বেগকে ‘গুরুত্বহীন’ হিসেবেই দেখছে আইসিসি।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির। বিশ্বকাপ মানেই নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন, খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারের বড় মঞ্চ, দেশের পরিচয়ের এক আন্তর্জাতিক জানালা। সেখানে না থাকতে পারা মানে কেবল একটি টুর্নামেন্ট মিস করা নয়, এটা হবে ইতিহাসের এক লজ্জাজনক অধ্যায়। কারণ, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যদি বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের বাইরে পড়ে যায়, তবে সেটি হবে ক্রিকেটের নয়, রাজনীতির বিজয়। অবশ্য এখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিষয়টিকে বড় করে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, স্কটল্যান্ডের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি দেখিয়ে আইসিসি বোঝাতে চাচ্ছে, বাংলাদেশ অপরিহার্য নয়। এই বার্তাটি যতটা নির্মম, ততটাই উদ্বেগজনক। দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক যাত্রা, নিয়মিত বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ, সব কিছু যেন এক মুহূর্তেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।

এখন বাংলাদেশের সামনে সময় খুব কম। সিদ্ধান্ত যাই হোক, সেটি সহজ হবে না। ভারত গিয়ে খেললে উঠবে আত্মসম্মানের প্রশ্ন, না গেলে হারাতে হতে পারে বিশ্বকাপের মঞ্চই। এই দোটানার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। একটি বিষয় তবে পরিষ্কার, এই অনিশ্চয়তা কেবল একটি দলের নয়, পুরো দেশের। আর যদি সত্যিই বাংলাদেশ বিশ্বকাপের বাইরে ছিটকে যায়, তা হলে ইতিহাস সাক্ষী থাকবে- এটি ক্রিকেটের খেলা ছিল না- ছিল ক্ষমতার খেলা।