নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবের ‘টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন’ (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ মামলার ১৭ আসামির মধ্যে ১২ জনই বর্তমান ও সাবেক সেনাকর্মকর্তা।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন। শুনানি চলাকালে আসামি পক্ষ ও প্রসিকিউশন পক্ষের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ এবং সময়ের আবেদন নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
শুনানির শুরুতে আসামি পক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন মামলার প্রস্তুতি ও সাক্ষ্যগ্রহণের আগে কমপক্ষে তিন মাস সময় প্রার্থনা করেন। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, ‘এই মামলা আমি হাতে নিয়েছি দুই মাসও হয়নি। এর মধ্যে তিন ঘণ্টাও ঠিক মতো ঘুমাতে পারিনি। আমাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে হবে এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো পর্যালোচনার জন্য সময়ের প্রয়োজন।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, তিনি দুইবার হার্ট অ্যাটাক করেছেন এবং তার শারীরিক অবস্থা বর্তমানে বেশ দুর্বল।
এর তীব্র বিরোধিতা করেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ওনাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এই বিচার হতে না দেয়া। আইনে তিন সপ্তাহ সময়ের কথা থাকলেও তারা ইতোমধ্যে সাত সপ্তাহ সময় নিয়েছে।’ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এ সময় অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে আদালতকে জানান, ‘আমাদের সাক্ষীদের ভয় দেখানো হচ্ছে, এমনকি চাকু মারা হচ্ছে। তারা বাইরে মিথ্যা হাইপ তোলার চেষ্টা করছেন। আমার সাক্ষীদের মেরে ফেললে আমি বিচার করব কীভাবে?’
শুনানির এক পর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম যখন আসামি পক্ষের সময়ের আবেদনের বিরোধিতা করে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন আদালত তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘কথায় কথায় আপনি দাঁড়াবেন না।’ পরবর্তীতে আসামি পক্ষের আইনজীবীর দীর্ঘ সময়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মন্তব্য করেন, ‘তা হলে তো ১৫ জন আসামি হলে ১৫ মাস সময় লাগবে।’ শেষ পর্যন্ত আদালত উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে আগামী ২১ জানুয়ারি (চার সপ্তাহ) সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য করেন।
মঙ্গলবার শুনানিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। তিনি বলেন, বিচারের মধ্য দিয়ে তথ্য-প্রমাণ পরীক্ষা করে দেখতে হবে। বিচার (ট্রায়াল) ছাড়া এ মামলা থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেয়া যাবে না। তা ছাড়া এই আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত গ্রাউন্ড পাওয়া গেছে। সে কারণে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হলো।
এর পর সব আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল। এজলাসের ডকে থাকা ১০ সেনা কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল। নাম উল্লেখ করার পর এই ১০ সেনা কর্মকর্তা দাঁড়ান। পরে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ তারা স্বীকার করেন কি না। জবাবে এই ১০ সেনা কর্মকর্তা বলেন, তারা নির্দোষ। এর মধ্যে একজন সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করি, এই আদালতের মাধ্যমে আমরা ইনসাফ পাবো।’
আদালতে উপস্থিত ১০ সেনা কর্মকর্তা হলেন : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো: কামরুল হাসান, মো: মাহাবুব আলম, কে এম আজাদ; কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, আনোয়ার লতিফ খান; লে. কর্নেল মো: মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন এবং মো: সারোয়ার বিন কাশেম।
এই মামলায় মোট ১৭ জন আসামির মধ্যে সাতজন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তালিকায় রয়েছেন: শেখ হাসিনা (সাবেক প্রধানমন্ত্রী); তারিক আহমেদ সিদ্দিক (সাবেক উপদেষ্টা); আসাদুজ্জামান খান কামাল (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী); বেনজীর আহমেদ ও এম খুরশীদ হোসেন (র্যাবের সাবেক মহাপরিচালকদ্বয়); মো: হারুন অর রশিদ এবং লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।
গত ২১ ডিসেম্বর আইনজীবী তাবারক হোসেন তিনটি বিশেষ আবেদন করেছিলেন যার মধ্যে ছিল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলমের জামিন প্রার্থনা, গুমের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অনুমতি এবং র্যাবের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রাপ্তি। ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছেন, এই আবেদনগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সময়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
আগামী ২১ জানুয়ারি মামলার পরবর্তী কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর গুম ও নির্যাতন মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
জিয়াউলকে গ্রেফতার দেখালো ট্রাইব্যুনাল : শতাধিক গুম-খুনের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানকে গ্রেফতার দেখিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে।
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। তিনি এ মামলায় জিয়াউলকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদনের পাশাপাশি অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানির জন্য সময় চান। পরে তার আবেদন মঞ্জুর করে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে আগামী ৪ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানি রেখেছেন।
এ দিন সকালে কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। যদিও মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় গত ২১ ডিসেম্বর তাকে হাজির করার কথা ছিল। কিন্তু কারাগারে আদেশ না পৌঁছায় হাজির করতে পারেনি কারা অধিদফতর। এতে ওই দিন ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি আজ হাজির করতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত।
এর আগে, ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল। ওই দিন শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ১০০-এর বেশি মানুষকে গুমের পর হত্যার প্রমাণ পেয়েছি আমরা। তিনিসহ তার অনুগতদের কাজই ছিল রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষকে গুমের পর বিভিন্নভাবে হত্যা করা। এসব হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে নাটক মঞ্চায়ন করতেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। এসব বাস্তবায়নের মাস্টারমাইন্ড বা মহানায়কও ছিলেন তিনি।
এ ছাড়া আরো ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়ার আবেদন করা হয়। ওই দিন সকালে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউশন। গুম-খুনই নয়, সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আরো বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।



