ওপরে চাকচিক্যের মেগা প্রকল্প, নিচে ‘মিনি নরক’

Printed Edition

আব্দুল কাইয়ুম

- শুধু মেগা প্রকল্প নয়; সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনার ভুলের ফল - ড. আরিফুল ইসলাম বিআইপি সভাপতি

- প্রকল্পের জীবনকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভুলগুলো বয়ে বেড়াতে হবে - ড. মো: হাদিউজ্জামান বুয়েট

রাজধানীর বুকে মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার কিংবা বিআরটিএর মতো মেগা প্রকল্পগুলো যখন উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, ঠিক তখনই এগুলোর নিচের সড়কগুলো পরিণত হয়েছে এক ‘মিনি নরকে’। বছরের পর বছর ধরে চলা নির্মাণকাজের অবহেলা, অব্যবস্থাপনা, সঙ্কুচিত সড়ক, আবর্জনা, জলাবদ্ধতা ও ধুলোবালুর রাজ্যে বন্দী হয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পথচারীদের জীবন। উন্নয়নের ‘চাকচিক্য’ মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গেলেও নিচের সড়কে পোহাতে হচ্ছে চরম যন্ত্রণা। পরিকল্পনাহীন ব্যবস্থাপনা ও ধীরগতির কারণে ঢাকার এই মেগা প্রকল্পের নিচের অংশটি বর্তমানে সাধারণ নগরবাসীর জন্য একটি স্থায়ী ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ধুলোবালু ও যাতায়াত সঙ্কট : সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, মতিঝিল, মালিবাগ ও ফার্মগেট এলাকার ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের নিচের সড়কগুলোতে ধুলার আস্তরণ এতই বেশি যে, সাধারণ মানুষের নিঃশ্বাস নেয়াই দায়। বিভিন্ন স্থানে ময়লার ভাগাড় ও ফুটপাথের অবৈধ দোকানের কারণে হাঁটার পথও রুদ্ধ। তা ছাড়া ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের পিলারের কারণে সড়ক সঙ্কুুচিত হয়ে পড়ায় সারাক্ষণই লেগে থাকছে তীব্র যানজট।

এ দিকে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে ঢাকার সিটি করপোরেশনগুলোর অনাগ্রহের কারণে ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রতিদিনের যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। ফাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের পরিত্যক্ত জায়গাগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার না করায় তা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের চিত্র ও জনদুর্ভোগ

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের সড়কে তৈরি হচ্ছে চরম জনদুর্ভোগ। উড়ালসড়ক দিয়ে ওপর দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটে গাড়ি চলে গেলেও নিচের রাস্তাগুলো সাধারণ মানুষের জন্য নরকে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে ধুলোবালুতে চার পাশ অন্ধকার হয়ে থাকে, আর সামান্য বৃষ্টিতেই গর্তগুলো পরিণত হয় নোংরা কাদার ডোবায়। এক্সপ্রেসওয়ের বিশাল সব পিলার বসানোর ফলে রাস্তার অর্ধেকেরও বেশি অংশ বন্ধ থাকে। ওপর দিয়ে টোল দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িগুলো দ্রুত চলে গেলেও নিচের গণপরিবহন ও সাধারণ যাত্রীদের কিলোমিটারের পর কিলোমিটারজুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জটলায় আটকে থাকতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় ফুটপাথ ভেঙে ফেলা হয়েছে অথবা নির্মাণসামগ্রী রেখে চলাচলের অনুপযোগী করা হয়েছে।

ড্রেনেজ বিপর্যয় ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁঁকি

মেগা প্রজেক্টগুলোর নিচের ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। উত্তরার দিয়াবাড়ি, পল্লবী, মিরপুর থেকে শুরু করে ফার্মগেট, শাহবাগ ও মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রচুর ধুলোবালু ও শব্দদূষণ তৈরি হচ্ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই দেখা দিচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা। মেট্রোরেল পুরোপুরি চালুর পরও এই সমস্যা প্রকট থাকার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ইএমপি) যথাযথ মানছে না। ঢাকার বাতাসে ক্ষতিকর পিএম ২.৫ এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার চেয়ে ৮.১ গুণ বেশি, যার একটি বড় অংশ আসছে এসব অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ থেকে। এর ফলে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, সিওপিডি এবং হৃদরোগের মতো জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া নির্মাণাধীন গর্ত ও ড্রেনেজ বিপর্যয়ের কারণে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যা ডেঙ্গু বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

অবৈধ দখল ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি

মেগা প্রকল্পের নিচের জায়গা ও ফুটপাথগুলো চলে গেছে অবৈধ দখলদারদের কবলে। অনেক জায়গায় নির্মাণাধীন স্টেশনের সিঁড়ি বা র‌্যাম্প ফুটপাথ দখল করে নেয়ায় পথচারীদের চলাচলের জায়গা সঙ্কুুচিত হয়ে পড়েছে। এমনকি কিছু এলাকায় প্রকল্পের নিচ থেকে মাটি কেটে অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে, যা পুরো কাঠামোর নিরাপত্তার জন্য ঝুঁঁকি তৈরি করছে। গাজীপুর রুটের বিআরটি প্রকল্পের মতো জায়গায় স্টেশনের এস্কেলেটর ও লিফটগুলো উন্মুুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখায় মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যমতে, মাত্র ছয়টি মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়নে দেরির কারণে দেশের প্রায় ১.১২ লাখ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা দিয়ে চারটি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব ছিল। এই ক্ষতির বড় অংশই আসছে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, যানবাহনের বাড়তি জ্বালানি খরচ এবং মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে। উত্তরা-গাজীপুর রুটের বিআরটি প্রকল্পের ১৪ বছরের দীর্ঘসূত্রতা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। সময়মতো প্রকল্প শেষ না হওয়ায় দেশ এই বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ কারিগরি মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতার অভাবে আজ এই দুর্ভোগ জনজীবনে জেঁকে বসেছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকল্পগুলোতে গত ১৫ বছরে দুর্নীতির কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়েছে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন সাধারণ মানুষের জীবনকে বিষিয়ে না তোলে। মেগা প্রকল্পের নিচের এই ‘মিনি নরক’ থেকে মুক্তি পেতে হলে নির্মাণকালীন জনভোগান্তি কমানো এবং পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় ওপর দিয়ে আধুনিক যান চললেও নিচ দিয়ে ধুঁকতে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠী দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো: হাদিউজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের যাতায়াত সহজ করা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি। ঢাকার মতো একটি জনবহুল এবং সুপ্রতিষ্ঠিত শহরে একবার পরিকল্পনা ভুল হলে তা সংশোধন করা প্রায় অসম্ভব। অনেক ফ্লাইওভারের নিচে প্রায় ৫০ শতাংশ জায়গা নষ্ট করা হয়েছে, যা আর সম্প্রসারণ করার সুযোগ নেই। যতক্ষণ এই স্ট্রাকচারগুলোর জীবনকাল শেষ না হচ্ছে, ততক্ষণ এই ভুলগুলো আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় হলো যতটুকু রাস্তা অবশিষ্ট আছে, সেগুলোকে হকার ও অবৈধ দখলমুক্ত করে জনগণের চলাচলের উপযোগী করা।’ তিনি আরো বলেন, ‘মেট্রো বা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে মানুষের গন্তব্যে পেঁঁৗঁছাতে হলে শেষ পর্যন্ত নিচের সড়কই ব্যবহার করতে হয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, কিছু কিছু প্রকল্পে জেনে-শুনে নিচের সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। মেট্রো বা এক্সপ্রেসওয়ের নিচে ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলেও তা কাজ করে না। শুধু একটি প্রকল্পের নিচে ড্রেন বানালে জলাবদ্ধতা কমবে না; এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান। আমাদের উন্নয়ন তখনই সফল হবে; যখন তা মানুষের সুবিধার কথা মাথায় রেখে করা হবে।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমাদের শহরে যে মেগা প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছে, তা মূলত সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণীকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। বিশেষ করে ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ওপর দিয়ে যানবাহন বা ট্রেন চলাচলের বিষয়টিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে; কিন্তু এই প্রকল্পের নিচের অংশের সৌন্দর্যবর্ধন বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন ছিল, তা চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। ফ্লাইওভারের কলামগুলোর কারণে রাস্তা কিছুটা সঙ্কুুচিত হলেও, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দখলমুক্ত রাখার মাধ্যমে বিদ্যমান রাস্তাটুকুকেও কার্যকর করা সম্ভব ছিল; কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে ফ্লাইওভারের নিচের জায়গাগুলো বেদখল হয়ে দোকানপাট বা অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা জনদুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শহরের একটি প্রধান সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা; তবে এটি কেবল মেগা প্রকল্পের কারণে নয়; বরং আমাদের সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনার ভুলের ফল। আমরা প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করে বক্সকালভার্ট বা ড্রেনের মতো কৃত্রিম ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, যা পানিকে নদী বা খাল পর্যন্ত পেঁঁঁৗঁছে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। নগর পরিকল্পনাকে কেবল বাণিজ্যিক বা প্রদর্শনের বিষয় হিসেবে না দেখে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। উন্নয়নের সুফল যেন সাধারণ মানুষ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; বরং মানুষের উপকারের কথা মাথায় রেখে জনবান্ধব ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করাই এখন সময়ের দাবি।’