কাজে আসছে না প্রধানমন্ত্রীর ১৮০ দিনের পরিকল্পনা

বন্ধ শিল্পকারখানা চালুকরণে উদ্যোগ নেই বিসিকের

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

ত্রায়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আওয়ামী দুঃশাসনে বন্ধ হওয়া পাটকল, বস্ত্রকল, চিনিকলসহ মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প চালুর দৃশ্যমাণ উদ্যোগ নিতে ১৮০ দিনের কর্মসূচি নেয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন। সরকারের প্রত্যাশায় এমন পরিকল্পনা হাতে নিলেও বাস্তবে এমন কিছু করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। বরং প্রতিষ্ঠানটিতে জেকে বসে থাকা আওয়ামী সিন্ডিকেটটি সরকারের এমন পরিকল্পনা কৌশলে ভেস্তে দিচ্ছে। পরিকল্পনা গ্রহণের প্রায় ৪ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বন্ধ হওয়া কোনো প্রতিষ্ঠান চালু করতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। এর মধ্যে বন্ধ শিল্প চালুকরণ ও রফতানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে পাটকল, বস্ত্রকল, চিনিকলসহ আওয়ামী দুঃশাসনে বন্ধ হয়ে যাওয়া মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে সেগুলো পুনরায় চালুর দৃশ্যমান উদ্যেগ নেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়। এই লক্ষ্যে সরকার, মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে দ্রুত সরকারি, পাবলিক-প্রাইভেট যৌথ মালিকানা কিংবা ব্যক্তি মালিকানায় সব বন্ধ শিল্প চালু করার কথা বলা হয়।

শিল্প খাতে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে উৎসাহ দিতে ট্যাক্স হলিডে, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেয়া এবং এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ন্যায্য ও সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়।

সারা দেশে এক গ্রাম এক পণ্য কর্মসূচি চালু করে প্রতিটি গ্রাম তার নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পণ্য যেমন সোনারগাঁওর জামদানি, টাঙ্গাইলের শাড়ি, রাজশাহীর সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, ঝালকাঠির শীতলপাটিকে উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নেয়া হয়।

সরকারের এই পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৮০ দিনের পরিকল্পনার ১২০ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত পরিকল্পনার একটিও বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিসিক। সরকার, মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে দ্রুত সরকারি, পাবলিক-প্রাইভেট যৌথ মালিকানা কিংবা ব্যক্তি মালিকানায় সব বন্ধ শিল্প চালু করার কথা বলা হলেও সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি সংস্থাটি।

বিসিকের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, বিসিক আঞ্চলিক কার্যালয়, চট্টগ্রাম ও ঢাকা হতে রুগ্ণ/বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। আঞ্চলিক কার্যালয় রাজশাহী জানিয়েছে যে, ইতোমধ্যে অধিকাংশ শিল্প নগরী হতে তথ্য সংগ্রহ করে ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলমান। বিসিক আঞ্চলিক কার্যালয় খুলনা থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিসিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে যে কর্মকর্তা চেয়ারম্যান হয়ে আসুক না কেন, তাকেই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট নানা কায়দায় নিয়ন্ত্রণে নেয়। ক্ষমতাধর এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট কৃতকর্ম নিয়ে বিসিকের সব কর্মকর্তা, কর্মচারীরা এতটাই ভিতু যে তারা সব সময় বদলি ও প্রশাসনিক শাস্তির ভয়ে আতঙ্কে থাকেন।

শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো: সাইফুল ইসলামকে বিসিক চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করা হয়। যোগদানের কিছুদিন পর থেকেই সেখানে দীর্ঘ ৬ বছর ধরে জেঁকে থাকা একজন উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা (পরিচালক, প্রকল্প) চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করেন। এরপর সেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করা একটি প্রকল্পের (কেমিক্যাল) পরিচালক, প্লাস্টিক শিল্প নগরী প্রকল্পের পরিচালক এবং পরিকল্পনা শাখার জিএম যাদের নিয়োগ নিয়ে দুদকের তদন্ত চলমান রয়েছে। এর মধ্যে প্লাস্টিক শিল্প নগরী প্রকল্পের পরিচালক ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রীকে ম্যানেজ করে পিডি নিয়োগের কার্যবিবরণী পরিবর্তন করে পিডি বনে যান। পিডি হয়ে প্রকল্প সংশোধনের নামে ইচ্ছামত প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করে নেন।

এসব অসাধু কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রধান কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন। বিসিকের শক্তিশালী এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়াসহ বেনামে বিসিকের উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারি কাজের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে বিসিক চেয়ারম্যান মো: সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ১৮০ দিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমরা প্রতি মাসেই সভা করছি। এখন পর্যন্ত কোনো শিল্প কারখানা চালু না হওয়া এবং টাস্কফোর্স গঠন না হওয়ার বিষয়ে তিনি অগ্রগতি প্রতিবেদন দেখে বলতে হবে বলে জানান।