ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল টিএসসি হয়ে শাহবাগ সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার টিএসসির সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা অবস্থান নেয় এবং বিভিন্ন স্লোগানে প্রাঙ্গণ মুখরিত করে তোলে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ‘আমার হত্যার বিচার চাই, বইলা গেছে হাদি ভাই’, ‘ভারত না বাংলাদেশ? বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ‘আমরা সবাই হাদি হবো, যুগে যুগে লড়ে যাবো’ এমন নানা স্লোগান দেন।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেছেন, ‘শহীদ ওসমান হাদি হত্যায় শত কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। যারা এই বিনিয়োগ করেছে, তারা শুধু শহীদ ওসমানের মাথায় গুলি করেনি, তারা বাংলাদেশের মাথায় গুলি করেছে, বাংলাদেশের পতাকায় গুলি করেছে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর গুলি করেছে।’
আব্দুল্লাহ আল জাবের অভিযোগ করেন, গতকাল শহীদ হাদি হত্যাকাণ্ডের চার্জশিট পর্যালোচনার শুনানি অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে মূল আসামিদের কাউকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘কারা তাদের আড়াল করতে চায়, আমরা তা বুঝি। রাষ্ট্র যদি তাদের আড়াল না করে, তাহলে তাদের লুকানোর কোনো পথ নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘গত ১৭ বছরে বিরোধী দলের কেউ যদি ৪০ ফুট মাটির নিচে লুকিয়েও থাকত, রাষ্ট্র তাকে খুঁজে বের করেছে। অথচ এখন যারা শহীদ ওসমান হাদিকে হত্যা করেছে, তারা দেশেই রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে তাদের রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। এ কারণেই আজ জনগণ রাজপথে নেমেছে, শহীদ ওসমান হাদির হত্যার বিচারের দাবিতে।’
হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও অর্থের প্রসঙ্গ টেনে জাবের বলেন, ‘একজন মানুষকে হত্যা করতে শত কোটি টাকার প্রয়োজন হয় না। এক লাখ টাকা দিলেই নেশাগ্রস্ত কিছু লোক খুন করে আসে। তাহলে প্রশ্ন হলো, এই শত কোটি টাকা কোথায়, কারা বিনিয়োগ করেছে এবং কেন?’
চার্জশিট নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার জন্য সেদিন পাঁচটি টিম ছিল, এ কথা তারা অস্বীকার করেনি। কিন্তু তাহলে চার্জশিটে শুধু চারজনের নাম কেন? যারা সরাসরি গুলি করেছে, শুধু তাদের নামই আছে। বাকি পাঁচটি গ্রুপের ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই কেন, এটা আমরা জানতে চাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা বলেছেন, পাঁচ তারিখে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে বসে ২১ জনের একটি টিম শহীদ ওসমান হাদিকে গুলি করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু চার্জশিটে ফয়সাল, মাসুদ ও আলমগীর ছাড়া সেই ২১ জনের আর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কীভাবে বলা হলো, ২১ জনের একটি টিম এই হত্যা মামলার সাথে জড়িত ছিল?’
সমাবেশ শেষে আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘আমার মনে হয়, রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরাও এই অন্যায়ের সাথে যুক্ত। বাংলার এই জমিনে শহীদ ওসমান হাদিরা মারা যাওয়ার পরও এ লড়াই চলবে।’
শাবিপ্রবিতে বিক্ষোভ
শাবিপ্রবি প্রতিনিধি জানান, শহীদ ওসমান হাদি হত্যার চার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও বিচার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে ইনকিলাব মঞ্চ শাবিপ্রবি শাখা। গতকাল জুমার নামাজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি কিলোরোড হয়ে গোলচত্বরে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়।
মিছিল ও সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা “আমি কে, তুমি কে হাদি হাদি”, “আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে”,“নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর”,“ওসমান হাদি আজাদি, আজাদি”, “বিচার বিচার বিচার চাই হাদি হত্যার বিচার চাই” সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
সমাবেশে ইনকিলাব মঞ্চের দফতর সম্পাদক শুয়াইব আহমেদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সংগঠনটির আহ্বায়ক হাফিজুল ইসলাম এবং যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব হাসান অনু। আহ্বায়ক হাফিজুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি যে চার্জশিট দেয়া হয়েছে, তাতে বহু অসঙ্গতি রয়েছে। এটি একটি সাজানো ও স্ক্রিপ্টভিত্তিক চার্জশিট। এমন একটি ভুয়া চার্জশিট আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। তিনি আরো বলেন, হাদি ভাই যেদিন গুলিবিদ্ধ হন, সেদিন প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে প্রয়োজনীয় আন্তরিকতা দেখা যায়নি। হত্যার আগে তিনি শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর সেই জিডিটি রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়।
মাহবুব হাসান অনু বলেন, শহীদ হাদি ছিলেন জুলাই-জুনের গণ-অভ্যুত্থানের একজন সম্মুখসারির নেতৃত্বদানকারী এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রাজপথের লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন। অথচ সেই আন্দোলনের একজন সাহসী কর্মীর হত্যার বিচার আজও নিশ্চিত না হওয়া চরম লজ্জাজনক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সরকার ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর থেকেই একজন বিপ্লবী মানুষের হত্যার বিচার না পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে সহায়তার পরিবর্তে অনেক সময় আন্দোলনের বিপরীতে প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
টঙ্গীতে বিক্ষোভ মিছিল
গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি জানান, টঙ্গীতে ‘ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী ছাত্র-জনতা’র ব্যানারে জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। টঙ্গীর এশিয়া পাম্প এলাকা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে শত শত ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন।
মিছিলটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে টঙ্গী সরকারি কলেজ গেট এলাকা প্রদক্ষিণ করে আবার এশিয়া পাম্পে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে বক্তারা শহীদ হাদি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান। একই সাথে তারা সকল প্রকার আধিপত্যবাদী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এ সময় বক্তব্য রাখেন জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা লাবিব মুয়ান্নাদ, সাবেক শিবির নেতা আফিফ হাসান ইয়াকুব, তা’মীরুল মিল্লাত কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের এজিএস মঈনুল ইসলাম এবং মুর্তুজা হাসান ফুয়াদ।



