শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই সব স্কুলে পৌঁছে যাবে বিনামূল্যের পাঠ্যবই

নতুন শিক্ষাবর্ষের এক মাস আগে অর্থাৎ চলতি বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে যেন পাঠ্যপুস্তক ছাপার কাজ শেষ করে সব স্কুলে বই পাঠিয়ে দেয়া যায় সেই পরিকল্পনা নিয়েই কাজ চলছে।

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

- ৩০ নভেম্বর টার্গেট নিয়ে কাজ শুরু

- ২০ সেপ্টেম্বরের আগেই প্রেসের সাথে চুক্তি

এবারই প্রথম নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক মাস আগেই প্রতিটি স্কুলে পৌঁছে যাবে বিনামূল্যের পাঠ্যবই। ২০২৬ সালের জন্য নতুন যে পাঠ্যবই ছাপানো হবে সেগুলো চলতি বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই সব স্কুলে পৌঁছানোর টার্গেট নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সে লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছরই নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে জানুয়ারির ১ তারিখ তথা বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া সব সরকারের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করে। স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে বিগত ১৬ বছরে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘটা করে বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়ার নামে মূলত নাটক সাজিয়ে খুদে শিক্ষার্থী এবং দেশের কয়েক কোটি অভিভাবকের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে ২০১০ সালের পর থেকে কোনো বছরেই পয়লা জানুয়ারি সব শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দিতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার। তবে বই উৎসবের নামে বিভিন্ন খাত উপ খাতে সরকারি অর্থ অপচয়ের যেন মহোৎসব ছিল।

যদিও ২০২৫ সালের পাঠ্যবইয়ের পরিমার্জন অর্থাৎ আওয়ামী আমলের বিতর্কিত কারিকুলাম বাতিল করে নতুন করে ২০১২ সালের কারিকুলামে ফিরে গিয়ে এবং সেখানেও নতুন বেশ কিছু বিষয় সংযোজন-বিয়োজন করার কারণে শিক্ষার্থীদের বই পেতে বিলম্ব হয়েছে। এ ছাড়া জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরে পাঠ্যবই মুদ্রণের আগের সব টেন্ডার বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করে এবং নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের কারণে বই বিতরণের এই বিলম্ব অভিভাবকদের মধ্যে নেতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু এখন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদেরও আশা- তারা নতুন বছরের শুরুতেই বই হাতে পাবেন। শিক্ষার্থীদের এই অনুভূতিকে ধারণ করে এনসিটিবিও নতুন করে তাদের কর্মপরিকল্পনা সাজিয়েছে। বিশেষ করে নতুন শিক্ষাবর্ষের এক মাস আগে অর্থাৎ চলতি বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে যেন পাঠ্যপুস্তক ছাপার কাজ শেষ করে সব স্কুলে বই পাঠিয়ে দেয়া যায় সেই পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছেন তারা।

এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এনসিটিবির কর্মকর্তা (বিতরণ নিয়ন্ত্রক) হাফিজুর রহমান নয়া দিন্তকে জানান, আমরা ২০২৬ সালের পাঠ্যবই মুদ্রণের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু টেন্ডারও আহ্বান করা হয়েছে। নবম শ্রেণী এবং ইবতেদায়ি শ্রেণীর টেন্ডার অফিস খোলার পরেই আহ্বান করা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এ বছর এক মাস আগেই সব বই আমরা স্কুলে স্কুলে পাঠিয়ে দিতে পারব আশা করছি।

অন্য দিকে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর রবিউল কবীর চৌধুরী এই প্রতিবেদককে জানান, পাঠ্যবই বিতরণে সময় ক্ষেপণ এবং অতীতের ভুল যাতে ভবিষ্যতে আর না হয় সে জন্য আমরা একটি রোডম্যাপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা পাঠ্যবই মুদ্রণের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই একটি নির্দিষ্ট টাইমফ্রেমও তৈরি করে সেই আলোকেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। চেয়ারম্যান আরো জানান, আগামী ২৩ জুনের মধ্যে আমরা সব টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করব। আর এসব টেন্ডার ওপেন করা হবে ১৪ জুলাই। এরপর আনুষঙ্গিক কিছু কাজ শেষ করে ২২ আগস্টের মধ্যে নোআ জারি করে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতাদের সাথে বই মুদ্রণের চূড়ান্ত চুক্তি করবে এনসিটিবি। আর এভাবেই আমাদের টার্গেট হলো ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের সব স্কুলে বই পৌঁছে দেয়ার।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী আমলের দীর্ঘ ১৬ বছরে শিক্ষার্থীদের বই উৎসবের নাম করে প্রতারণা করা হয়েছে। কেননা বিগত বছরগুলোতে বই বিতরণের যে পরিসংখ্যান দেখা যাচ্ছে সেখানেই এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, অতীতে কোনো বছরেই আওয়ামী লীগ সরকার বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। পরিসংখ্যানই বলছে সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিতরণ শেষ হয়েছিল ৭ মার্চ। ২০২২ সালে বই বিতরণ শেষ হয়েছিল ২৪ মার্চ। ২০১৯ সালে বিনামূল্যের পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে যায় সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল। ২০১৭ সালে বই পায় শিক্ষার্থীরা ২৪ ফেব্রুয়ারি। ২০১৬ সালে বই পায় ২২ মার্চ। আর ২০১০ সালে শিক্ষার্থীদের হাতে সর্বশেষ বই পৌঁছায় ২১ জুলাই তারিখে। যদিও আওয়ামী লীগ বরাবরই প্রচার করে আসছে যে, তারা শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দিতে পেরেছে। এটা নিছক একটা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী আমলের বিগত বছরগুলোতে বই উৎসবের আড়ালে অর্থ লুটপাটের আয়োজন হয়েছে নির্লজ্জভাবে। এনসিটিবির বিল ভাউচারের বেশ কয়েকটি কপি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বই উৎসবের নামে ২০২১ সালের পর ২০২২ সালেই মাত্র এক বছরের ব্যবধানে হল ভাড়া বাবদ ব্যয় ১০ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে। ২০২১ সালের বই উৎসবে ঢাকার একটি হল ভাড়া বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে সাত লাখ ৬২ হাজার ৩০০ টাকা। কিন্তু এক বছর পরেই ২০২২ সালে ওই একই হলের ভাড়া অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য হলেও দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ ৯৩ হাজার ৬২ টাকা। বিশেষ করে ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই চার বছরে শুধু এনসিটিবি থেকেই ১৫টি বিলের মাধ্যমে ৭৩ লাখ ২১ হাজার তিন টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে বই উৎসবের আড়ালে প্রকৃত অর্থে টাকা ভাগবাটোয়ারাও হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

অবশ্য অতীতের এমন অর্থ লোপাটের সংস্কৃতি থেকে রেব হওয়ার জন্যই ২০২৫ সালে সারা দেশে ঘটা করে বই উৎসব করার পরিকল্পনা বাতিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত বছর বই উৎসবের পরিবর্তে অনলাইনের মাধ্যমে ই-বুক উদ্বোধন করেছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা। ই-বুকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই ডাউনলোড দিয়ে বছরের প্রথম দিনেই নতুন বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিল।