বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

ভূতাত্ত্বিক সমিতির আশঙ্কা

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি ছিল ডেমেজিং আর্থকোয়েক। কিন্তু এর মাত্রা ডেস্ট্রাক্টিভ আর্থকোয়েকের (ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প) কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরতার এ ভূমিকম্প ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত ব্যাপকভাবে অনুভূত হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক সমিতি। নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় সংঘটিত ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর এ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি জানায়, বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান অত্যন্ত জটিল, তাই এখনই ঝুঁকি কমাতে সমন্বিত গবেষণা, কার্যকর পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি নিতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আনোয়ার জাহিদ।

ড. আনোয়ার জাহিদ বলেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি ছিল ডেমেজিং আর্থকোয়েক। কিন্তু এর মাত্রা ডেস্ট্রাক্টিভ আর্থকোয়েকের (ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প) কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরতার এ ভূমিকম্প ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত ব্যাপকভাবে অনুভূত হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ কেন ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে? এর উত্তরে ভূতাত্ত্বিক জরিপ সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের কনভারজেন্ট বাউন্ডারিতে অবস্থান করায় ভূগর্ভে পুঞ্জীভূত চাপ যেকোনো সময় বড় ভূমিকম্পের সৃষ্টি করতে পারে। কনভারজেন্ট বাউন্ডারি হলো এমন একটি ভূতাত্ত্বিক স্থান যেখানে দু’টি টেকটোনিক প্লেট একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে সংঘর্ষ করে, যার ফলে একটি প্লেট অন্যটির নিচে চলে যায় (সাবডাকশন) এবং পৃথিবীর ভূত্বক ধ্বংস হয়। এই সীমানার ফলে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি এবং পর্বতমালা গঠিত হয়। তারা বলছেন, বাংলাদেশ স্থির নয়, মধ্যাঞ্চল বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক কম্পনগুলো দেখিয়ে দিয়েছে ভূগর্ভে চাপ জমে আছে। এমতাবস্থায় যেকোনো বড় ভূমিকম্প হতে পারে। এমন হলে কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে যেন বড় বিপর্যয় থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা যায়। তারা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় বড় ভূমিকম্প হলে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। সমিতি বলছেন, ভূমিকম্পে আতঙ্ক বা ভয় নয়, প্রস্তুতিই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস দেয়া না গেলেও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল শনাক্ত করা, সক্রিয় ফল্ট চিহ্নিত করা এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকি চিহ্নিত করে জোনিং ম্যাপ প্রস্তুত করা এখন সময়ের দাবি।

সমিতির নেতৃবৃন্দ ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনায় তিনটি স্তরের রূপরেখা তুলে ধরেন। এগুলো হলো- গবেষণা ও ঝুঁকি নিরূপণ করে সক্রিয় ও সুপ্ত ফল্টলাইন শনাক্তকরণ, প্লেট বাউন্ডারির বিস্তৃতি ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ, জাতীয় ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্র হালনাগাদ, ঢাকায় জরুরি ভিত্তিতে মাইক্রোজোনেশন ম্যাপ তেরি করা। ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে গেলে উদ্ধারকাজে আরো দক্ষতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে ভূতাত্ত্বিক সমিতি।

প্রতিরোধমূলক নকশা ও অবকাঠামো তৈরির ওপর জোর দিয়ে তারা বলছেন, ভূমিকম্প সহনীয় ভবন নকশা, প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের বাধ্যতামূলক সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। সমিতি সরকারের উদ্দেশে এ ব্যাপারে ৯ দফা সুপারিশ করেছে।