রাজনৈতিক দলের প্রতি ঝুঁঁকে পড়েছে মাঠ প্রশাসন

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেয়ার অভিযোগ উঠেছে একাধিক রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে। পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিশ্চিত করতে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের আস্থাভাজন হওয়ার জন্য মাঠ প্রশাসনের একাংশের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শামছুল ইসলাম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেয়ার অভিযোগ উঠেছে একাধিক রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে। পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিশ্চিত করতে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের আস্থাভাজন হওয়ার জন্য মাঠ প্রশাসনের একাংশের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঠ প্রশাসনে কর্মরত প্রায় দুই ডজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। এতে বিব্রত হচ্ছেন পেশাদার ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টসূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

গত বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সাথে বৈঠক করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বৈঠকে দলটির নেতারা অভিযোগ করেন, নির্বাচনের মাঠে এখনো ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত হয়নি। তাদের দাবি, প্রশাসনের একটি অংশ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে, যার প্রভাব পড়ছে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, ‘একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত এসেছে। কোথাও মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, কোথাও হয়নি। এর পেছনে দলীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইসিকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। দলীয় আনুগত্যে কাজ করা ডিসি ও এসপিদের অপসারণ করে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ না দিলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার কারণে কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলম (সালেহী)-এর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণ দেবনাথ। অথচ একই ধরনের ঘটনায় দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো দলিল জমা না দিয়েই ফেনী-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আওয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।

অন্য দিকে আদালত অবমাননার একটি অভিযোগে কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা হাততালি দেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে হামিদুর রহমান আযাদ নির্বাচন কমিশনে আপিল করলে তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘পলাতক’ আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ একে একরামুজ্জামান সুখনের নামে দাখিল করা মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর একরামুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, নাসিরনগর, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা-পূর্ব ও উত্তরা-পশ্চিম থানাসহ মোট সাতটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

সংশ্লিষ্টসূত্র জানায়, একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে দেশের কয়েকটি জেলায় তাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের ডিসি, এসপি ও ইউএনও হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এসব কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ওই প্রভাবশালী নেতাদের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা বিভাগের একটি জেলার জেলা প্রশাসকের স্বামীর ব্যবসায়িক অংশীদার ওই জেলার একটি আসনের প্রার্থী। অভিযোগ রয়েছে ওই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের প্রভাবেই শুধু ডিসিই নয়; সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারও তার পছন্দ অনুযায়ী পদায়ন পেয়েছেন।

রাজশাহী বিভাগের একটি জেলার জেলা প্রশাসক বুয়েট ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হল শাখার সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফজলুল হক হলের সাবেক ছাত্রদল নেতা ঢাকা বিভাগের একটি জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়িত। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভিসির ভাই উত্তরবঙ্গের একটি জেলার পুলিশ সুপার। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জেলার পুলিশ সুপার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি। ছাত্রদলের সাবেক প্রকাশনা সম্পাদকের ভাই যিনি নিজেও ছাত্রদলের সাবেক নেতা- দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছাত্রদলের সাবেক আইনবিষয়ক সম্পাদক রয়েছেন উত্তরবঙ্গের আরেকটি জেলার পুলিশ সুপার পদে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচনের আগেই মাঠ প্রশাসনে নিজেদের পছন্দের লোক বসাতে তৎপরতা শুরু করেন একটি দলের আস্থাভাজন কর্মকর্তারা। ভোটের আগে জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে তীব্র চাপ তৈরি হয়। ২৯ জেলায় যে ডিসি পদায়ন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পরে একাধিক জেলা প্রশাসকের পদায়ন বাতিলও করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে পরিপত্র লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় পদায়ন হওয়া ২৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত ১৫ জন পূর্বে সচিবালয় বা ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। ঢাকার আশপাশের অনেক লোভনীয় উপজেলায় পদায়ন দেয়া হয়নি। আবার লোভনীয় উপজেলাগুলো থেকে প্রত্যাহার করা কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদায়নেও আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ জেলায় দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নের পর তাদের মাধ্যমে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অফিসার্স ক্লাবে বসে কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ফোন করে এ ধরনের সহযোগিতা চাইছেন বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন ‘সিনিয়র স্যাররা আগামী দিনে ক্ষমতায় আসতে পারে- এমন একটি দলের প্রার্থীদের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন। প্রয়োজনে সহযোগিতা দিতে বলছেন এবং ক্ষমতায় এলে তা মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অবসরপ্রাপ্ত বিসিএস অফিসার্স ফোরামের সদস্যসচিব ও সাবেক সচিব প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শরিফুল আলম দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বেশ কিছু রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তে অনেক প্রার্থী সংক্ষুব্ধ হয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে তারা নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারছেন না। প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারালে প্রভাবশালী দলগুলো প্রশাসনকে সহজেই প্রভাবিত করতে পারে; অতীতে আমরা তা দেখেছি। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তসাপেক্ষে তাকে দ্রুত কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং নির্বাচনসংক্রান্ত সব কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। পরবর্তীতে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনে চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থাও নিতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বিভাগীয় কমিশনার অফিস এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগ বক্স স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।’