ছয় মাসের মূল্যায়ন

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, আইনশৃঙ্খলা জ্বালানি ও ব্যাংকিংয়ে ব্যর্থ সরকার : জামায়াত

Printed Edition
জামায়াতে ইসলামীর সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন মিয়া গোলাম পরওয়ার  : নয়া দিগন্ত
জামায়াতে ইসলামীর সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন মিয়া গোলাম পরওয়ার : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো সাফল্য দেখা যায়নি বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার কাক্সিক্ষত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

গতকাল রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, প্রচারের বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, নির্বাহী পরিষদ সদস্য আব্দুর রব, সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, জাহিদুর রহমানসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার ছয় মাস পর এখন প্রতিশ্রুতির ভাষায় নয়, বাস্তব ফলাফল, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের প্রতি জবাবদিহির মানদণ্ডে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের সময় এসেছে। তার দাবি- সরকারের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ, নীতিগত দ্বিধা, সিদ্ধান্তহীনতা ও বাস্তব ফলাফলের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের নেতিবাচক ভূমিকার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণ স্পষ্ট রায় দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা ছিল এবং পরিষদকে প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের কাঠামো কার্যকর হয়নি।

জুলাই সনদের ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের এ নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এবং শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো থাকলেও গত ছয় মাসে এগুলোর কোনো একটিরও বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।

বিএনপি নেতাকর্মীদের হাতে গত ছয় মাসে বিরোধী দলের ছয়জন নেতাকর্মী খুন হয়েছেন অভিযোগ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, অতীতে যেভাবে ছাত্রলীগ-যুবলীগ নৃশংস কায়দায় হামলা চালাত, ঠিক সেভাবেই হামলা চালাচ্ছে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা।

তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে এবং রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান ঘটবে। কিন্তু ছয় মাসের বাস্তবতায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

পুলিশ সদর দফতরের আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মার্চ থেকে মে এই তিন মাসে ৯১৫টি হত্যা মামলা, ৪৬১টি ডাকাতি, ২৮৬টি অপহরণ, ৩ হাজার ২৭৭টি চুরি এবং ৫ হাজার ৪৪৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা পাওয়া গেছে। তার দাবি, শুধু মার্চ-মে ২০২৬ সময়ে ৯১৫টি হত্যা মামলা নিবন্ধিত হয়েছে, যেখানে পুরো ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৬৭ এবং ২০২৪ সালে ৭৯৪টি।

জ্বালানি সঙ্কট নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে পড়ছে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে শিল্পকারখানায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শিকার হয়েছেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও প্রথম ছয় মাসেই প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ জোরালো হয়েছে।

তিনি বলেন, একই সময়ে ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপি নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়োগের তথ্যও এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দ্রব্যমূল্য নিয়েও সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত। দলটির মূল্যায়নে বলা হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জুন ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অথচ আগের বছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাত দিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসেও খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা এবং উচ্চ সুদের চাপ থেকে বের হওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।

গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গুমের মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে, এটি জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম মৌলিক প্রত্যাশা। সরকার ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড রেমেডি অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অ্যাক্ট, ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও খসড়ার কয়েকটি বিধান নিয়ে জাতিসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ জানিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি আট দফা আহ্বান জানায় জামায়াতে ইসলামী। এর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ, গ্যাস ও জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করা। এ ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মধ্যপ্রাচ্য, জ্বালানি কূটনীতি, শ্রমবাজার ও বৃহৎ শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলসহ পূর্ণাঙ্গ পররাষ্ট্রনীতি কাঠামো প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় বাজার সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী, অস্বাভাবিক মুনাফা ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বানও জানিয়েছে দলটি।

ব্যাংকিং খাতে আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা, প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা নেয়া, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা এবং দুর্বল ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়। একই সাথে ব্যাংকিং খাতে যেকোনো দলীয় বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।