অর্থনীতিতে সতর্কতার ইঙ্গিত

মুদ্রা সরবরাহ বাড়লেও গতি কম বেসরকারি ঋণে

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুদ্রা সরবরাহ ও মোট ঋণপ্রবাহে কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। একই সাথে সরকারি খাতে ব্যাংকঋণের দ্রুত বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির নি¤œমুখী প্রবণতা দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে দাঁড় করিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গত রোববার ‘নির্বাচিত সূচক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ মানি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থনীতিতে সরবরাহ হওয়া মূল মুদ্রার পরিমাণ বছরে ১০.৩৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ব্রড মানি (এম২)- যার মধ্যে নগদ অর্থের পাশাপাশি ব্যাংক আমানতও অন্তর্ভুক্ত-বেড়েছে ৯.৪৬ শতাংশ। অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে অর্থের প্রবাহ বাড়ার এই প্রবণতা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ ও ভোগ বাড়াতে সহায়ক হওয়ার কথা।

এ ছাড়া মোট দেশীয় ঋণ প্রবৃদ্ধিও হয়েছে ১০.৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ও বেসরকারি খাতে মোট ঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু এই বৃদ্ধির ভেতরের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য- বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে খুবই কম।

তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.০৩ শতাংশ। শিল্প, ব্যবসা ও বিনিয়োগকার্যক্রমের জন্য এই খাতের ঋণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এর নি¤œ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ধীরগতি এবং শিল্প উৎপাদনে চাপের ইঙ্গিত দেয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট, ডলার সঙ্কট এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেসরকারি খাতে ঋণচাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সরকারের প্রতি নেট ব্যাংকঋণ বেড়েছে ২৯.৬৬ শতাংশ। এটি মূলত বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির প্রতিফলন। সরকার যখন বেশি ঋণ গ্রহণ করে, তখন তা প্রায়ই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে সঙ্কুচিত করে- যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব বলা হয়।

মুদ্রানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মূল্যস্ফীতি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশের বেশি। তবে বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের ফলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৮.৬৫ শতাংশের কাছাকাছি এসেছে। মূল্যস্ফীতির এই নি¤œমুখী প্রবণতা অর্থনীতির জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিলেও তা এখনও কাক্সিক্ষত মাত্রার তুলনায় বেশি। এদিকে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার। ডিসেম্বর ২০২৩ সালে যেখানে মোট ঋণের মাত্র ৯ শতাংশ ছিল খেলাপি, সেখানে ডিসেম্বর ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২০.২০ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৫ সালের জুনে এই হার আরো বেড়ে ৩৪.৪০ শতাংশ হয়। যদিও ডিসেম্বর ২০২৫-এ তা কমে ৩০.৬০ শতাংশে নেমেছে, তবুও এটি ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।

ঋণ বিতরণের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কৃষি ও গ্রামীণ ঋণ বিতরণ হয়েছে তিন হাজার ৩৫১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত মোট বিতরণ হয়েছে ২৪ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখতে এই ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিল্প ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) খাতেও মাঝারি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। শিল্প খাতে মোট বকেয়া ঋণ বর্তমানে প্রায় চার লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে আরো শক্তিশালী বিনিয়োগ প্রবাহ প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্রমাগতভাবে কমেছে। ২০২২ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.১০ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে ৫.৭৮ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৪.২২ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলার সঙ্কট এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপ এই নি¤œমুখী প্রবণতার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে অর্থনীতির সাম্প্রতিক চিত্রে একদিকে মুদ্রা সরবরাহ ও কিছু খাতে ঋণপ্রবাহের ইতিবাচক দিক রয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি, খেলাপি ঋণের চাপ এবং সরকারি ঋণ বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারো স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।