নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম
ভোজ্যতেল, চিনি ও ময়দার দাম লাফিয়ে বাড়ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, গ্যাসসঙ্কট ও আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেট বাড়ার অজুহাতে যে যার মতো দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাজার তদারকিতে সরকারের তৎপরতা দৃশ্যমান না থাকায় যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেট ভোক্তাদের পকেট কাটছে এমন অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী আমলের পুরনো সিন্ডিকেট আবারো সক্রিয় হচ্ছে কি না এমন সন্দেহও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
দেশের প্রধান ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে বৃহস্পতিবার গতকাল প্রতি মণ সয়াবিন তেল (৩৭.৩২ কেজি) ৭৫৫০ টাকা, প্রতিমণ চিনি ৩৮০০ টাকা এবং খোল ময়দা প্রতিমণ ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আমদানিকারক নয়া দিগন্তকে জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন এবং পামতেলের বুকিং রেট প্রতি টনে ১০০ ডলার বেড়েছে। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে বাজারে। ট্রেডিং ইকোনমিক্সের তথ্য অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতি টন সয়াবিন তেল ১২২৫ ডলারে বিক্রি হয় আন্তর্জাতিক বাজারে, এতে বাংলাদেশী টাকায় প্রতি কেজির বুকিং রেট পড়ে ১৫৩ টাকা। পাম অয়েলের দাম ৪৭৩৪ মালয়েশিয়ান রিংগিত, এতে বাংলাদেশী টাকায় প্রতি কেজির বুকিং রেট পড়ে ১৪৩ টাকা। এক দিনের ব্যবধানেই আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের দাম .২৬% এবং পামতেলের দাম ১.৭২% বেড়েছে বলেও সূত্র জানায়। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেনÑ আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেট বাড়লেও সেই তেল বাংলাদেশে এখনো পৌঁছায়নি। কিন্তু দেশের বাজারে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটারে সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ টাকা বেড়ে গেছে।
এ দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চিনি সিন্ডিকেট খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও নতুন করে ফনা তুলেছে ওই সিন্ডিকেট। গ্যাসসঙ্কটের অজুহাতে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে প্রতিদিন বাড়ছে চিনির দাম। গত ১৫ দিনের ব্যবধানে পাইকারিতে প্রতি মণ (৩৭.৩২০ কেজি) চিনির দাম বেড়েছে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। গতকাল খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে প্রতি মণ চিনি ৩৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। বিজনেস ইনসাইডার বলছে গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি দশমিক ৪ ডলার হিসেবে প্রতি টন চিনির আন্তর্জাতিক বুকিং রেট ছিল ৪০০ ডলার। সেই হিসেবে প্রতি কেজি চিনির ক্রয়মূল্য পড়ে ৫০ টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সঙ্কটের অজুহাতে বাজারে চিনির সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন মিল মালিকরা। এসব মিল মালিক পুরনো কায়দায় সিন্ডিকেট করে চিনির দাম বাড়াচ্ছেন বলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ।
ইতঃপূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে চিনির আমদানি উন্মুক্ত করার কারণে সঙ্ঘবদ্ধ ওই চিনি সিন্ডিকেট কয়েক মাস কোণঠাসা ছিল। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই পুরনো কায়দায় মিল মালিকদের সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে কস্টিংয়ের চাইতে কম দামে চিনি বিক্রি করে সাধারণ চিনি আমদানিকারকদের লোকসানের মুখে ঠেলে দেয় এবং একপর্যায়ে বাজারের নিয়ন্ত্রণ আবারো তারা নিয়ে নেয়।
ঊর্ধ্বমুখী ময়দার দাম
সরবরাহ সঙ্কটের অজুহাত করেই বেড়ে চলেছে ময়দার দাম। কয়েকটি শিল্পগ্রুপের বাজারে অনুপস্থিতির সুযোগে বাজারে সক্রিয় শিল্পগ্রুপগুলো একচেটিয়া দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে। গত কোরবানির ঈদের পর হতে পাইকারি বাজারেই বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) প্রায় ৮০০ টাকা বেড়েছে ময়দার দাম। তবে আমদানিকারকরা বলছেন, ডলার সঙ্কটের কারণে পর্যাপ্ত এলসি হচ্ছে না। ফলে কানাডিয়ান কোয়ালিটির গমের সর্টেজ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- কানাডিয়ান গমের গুণগত মান ভালো, ফলে এর বাজারে চাহিদাও ব্যাপক। কিন্তু এলসির সঙ্কটে বাজারে কানাডিয়ান কোয়ালিটির গমের স্বল্পতা রয়েছে। ব্যাংকগুলোর নানা শর্তের কারণে ক্ষুদ্র আমদানিকারকরা সহজেই ব্যাংকের সহায়তা পান না। ফলে আমদানিকারকের সংখ্যাও হাতেগোনা। পাশাপাশি আর্জেন্টাইন গম বাজারে থাকলেও গুণগত মান দুর্বল হওয়ায় এর চাহিদা কম। সামগ্রিকভাবে বাজারে সরবরাহ সঙ্কট দেখা দেয়ায় ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিচ্ছেন বলে সূত্র জানায়।
ব্যবসায়ী দিদারুল আলম বলেন, সরকার কঠোরভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ না করলে বাজার সিন্ডিকেট আরো সক্রিয় হবে। ভোক্তাদের কথা সরকারের মাথায় আছে কি না এমন সন্দেহ করেন এই ব্যবসায়ী। তেল, চিনি ও ময়দার দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলেও এই ব্যবসায়ী দাবি করেন।
টিসিবির তালিকায় এসব পণ্যের দাম
টিসিবির তথ্য বলছে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয়েছে ১১০ টাকা কেজি দরে। যা এক সপ্তাহ আগেও বিক্রি হয়েছে ১০৩-১০৫ টাকা কেজি দরে। গতকাল প্রতি কেজি খোলা ময়দা বিক্রি হয়েছে ৬৫ টাকা দরে। প্রতি কেজি ৪৪ টাকা দরে বিক্রি হওয়া খোলা ময়দা দাম বাড়তে বাড়তে এখন ৬৫ টাকায় উঠেছে। আর প্যাকেট ময়দা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০-৭৫ টাকা দরে। টিসিবির হিসাবে গতকাল খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে প্রতি লিটার ১৯২ টাকা দরে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২.১৭ শতাংশ বেশি।



