দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট ও গুজব প্রতিরোধ এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ল্েয কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নির্দেশনায় বিপিসি এবং তাদের অধীনস্থ বিপণন কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে এই বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একই সাথে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ডিপোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার জারি করা পৃথক দু’টি নির্দেশনায় এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, কিছু এলাকায় হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি এবং বাজারে গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। এ অবস্থায় সরকার সরবরাহ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি সমন্বিত তদারকি কাঠামো চালু করার উদ্যোগ নেয়। বিপিসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডিলারদের কাছ থেকে আকস্মিকভাবে বাড়তি জ্বালানি চাহিদা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সব েেত্র তাৎণিকভাবে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে অনাকাক্সিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গায় প্রধান স্থাপনা, খুলনার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং বরিশাল ডিপোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ডিপো দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় সেগুলোকে ‘কেপিআইভুক্ত স্থাপনা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে যেকোনো পরিস্থিতিতে এসব স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে বিপিসি সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপকে অনুরোধ জানিয়েছে।
এ দিকে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি সার্বণিকভাবে পর্যবেণের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি মনিটরিং সেল এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৃথক আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেলগুলো নিয়মিতভাবে জ্বালানি তেলের মজুদ, সরবরাহ এবং বিক্রির তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবে। নতুন ব্যবস্থার আওতায় আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেলগুলো প্রতিদিন তাদের অধীনস্থ ডিপোগুলোর পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুদ, সরবরাহ এবং বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করবে। এতে স্থলভাগে সংরতি জ্বালানি তেলের পরিমাণের পাশাপাশি জাহাজে থাকা ভাসমান মজুদের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
একই সাথে প্রতিদিন ডিপো থেকে ডিলার ও এজেন্টদের কাছে কত পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে এবং খুচরা বাজারে বিক্রির পরিস্থিতি কী, সেসব তথ্যও কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেলে পাঠানো হবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় সেল সার্বিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির একটি সমন্বিত প্রতিবেদন তৈরি করবে। পরে সেই প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হবে। এতে সরকার দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ দিকে চলমান কৃষি সেচ মৌসুমকে সামনে রেখে ডিজেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে। কৃষি খাতে যাতে জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘœ না ঘটে, সে জন্য ডিপো থেকে ডিলার ও এজেন্টদের কাছে সরবরাহের তথ্য নিয়মিতভাবে জেলা প্রশাসকদের কাছেও পাঠানো হবে।
আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেলগুলো সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসকদের কাছে প্রতিদিন সরবরাহ ও বিক্রির তথ্য পাঠাবে, যাতে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনে দ্রুত বাজার পরিস্থিতি পর্যবেণ করে ব্যবস্থা নিতে পারে। এতে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট বা অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের মতো পরিস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মজুদ, বিতরণ, পাচার কিংবা ভেজালসংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তাৎণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কন্ট্রোল সেলকে জানাতে হবে। প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করে প্রয়োজন হলে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে জ্বালানি তেল পাচার ও ভেজাল প্রতিরোধেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিপিসির কেন্দ্রীয় মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল স্থাপন করা হয়েছে চট্টগ্রামের সল্টগোলা রোডে অবস্থিত বিপিসির বিএসসি ভবনে। এই সেলের মুখ্য সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব এ কে এম ফজলুল হক। তার সাথে বিপিসির বণ্টন ও বিপণন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় সেলের পাশাপাশি দেশের পাঁচটি অঞ্চলে পৃথক আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেল গঠন করা হয়েছে। অঞ্চলগুলো হলো- ঢাকা, বগুড়া, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল। সংশ্লিষ্ট বিপণন কোম্পানিগুলোর আঞ্চলিক কার্যালয়ে এসব সেল স্থাপন করা হয়েছে এবং সেখানে সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও ব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত এই তদারকি ব্যবস্থা চালু হলে দেশের জ্বালানি তেলের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারের কাছে প্রতিদিনের হালনাগাদ তথ্য থাকবে। এর ফলে বাজারে গুজব, কৃত্রিম সঙ্কট বা মজুদদারির মতো পরিস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
তাদের মতে, এই উদ্যোগ জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে সহায়তা করবে এবং দেশের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ডিপোগুলোর নিরাপত্তা জোরদার হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



