আবুল কালাম
বৃদ্ধাশ্রমে থাকা নিঃসঙ্গ প্রবীণদের জীবনের গল্প গভীর বেদনা আর নীরব আর্তনাদে ভরা। তাদের পরাজিত জীবনের রক্তশীতল স্মৃতিতে স্তব্ধ হয়ে আছে প্রতিটি আশ্রমের দেয়াল। সেখানে প্রবেশ করলেই কানে ভেসে আসে অগ্রজদের দীর্ঘশ্বাস- থরে থরে জমে থাকা হাহাকার, অভিমান আর বিষাদের অনুচ্চারিত গল্প। প্রিয়জনকে না দেখার আকুতি, উৎসবের দিনেও সন্তানের মুখ না দেখার বেদনা যেন বুকের ভেতর অগ্নিদগ্ধ তের মতো জ্বলতে থাকে।
যে সন্তানদের জন্য একসময় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তারা, সেই সন্তানদের দূরত্বই এখন তাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট। নিঃসঙ্গ রাতগুলোতে স্মৃতিরা ফিরে আসে- ত্যাগ, ভালোবাসা আর সংগ্রামের দিনগুলো- যা তাদের অন্তরকে প্রতিনিয়ত তবিত করে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন বিদায়ের ঘণ্টা বেজে ওঠে, তখনো অনেকের ভাগ্যে জোটে না আপনজনের শেষ স্পর্শ। মৃত্যুর পরও স্বজনহীনতার নির্মম বাস্তবতা- অনেককে আশ্রম কর্তৃপরে ব্যবস্থাপনাতেই দাফন বা সৎকার সম্পন্ন করতে হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশ কিছু বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে, যদিও এর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা নেই। সরকারিভাবে সমাজসেবা অধিদফতরের অধীনে পরিচালিত রয়েছে মাত্র ছয়টি শান্তিনিবাস বা বৃদ্ধাশ্রম। চাহিদার তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত হলেও প্রবীণদের আশ্রয় ও সেবার ল্েয বিভিন্ন স্থানে এসব প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি ৬০ বছর ঊর্ধ্ব মানুষ রয়েছেন। তাদের একটি অংশ পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক পরিবর্তন কিংবা অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে বৃদ্ধাশ্রমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। সময়ের সাথে সাথে এই চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যৌথ পরিবার প্রথার ভাঙনই প্রবীণদের এই একাকীত্বের অন্যতম কারণ। এক সময় যে সন্তান বাবা-মাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারত না, আজ তারাই অনেক েেত্র তাদের ‘বোঝা’ মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছে। আবার কেউ কেউ সন্তানের অবহেলা, অবজ্ঞা ও দুর্ব্যবহার সহ্য করতে না পেরে নিজেরাই আশ্রয় নিচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু সেখানে গিয়েও শেষ বয়সে অপরিচিত পরিবেশে তাদের কাটাতে হয় নিঃসঙ্গ ও মানসিকভাবে কান্তিকর জীবন। অতীতের স্মৃতি তখন তাদের নিরন্তর তাড়িয়ে বেড়ায়, বাড়িয়ে তোলে বিষাদ, অভিমান আর শূন্যতার অনুভূতি। একসময় তা আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্থিতি পর্যন্ত নষ্ট করে দেয়।
আগারগাঁও প্রবীণ নিবাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখানে যেমন দরিদ্র পরিবারের প্রবীণরা আছেন, তেমনি ধনাঢ্য পরিবারের অনেক শিতি ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। শিক, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, কলেজের অধ্যাপক- বিভিন্ন পেশার মানুষই এখানে বাস করেন। তাদের অনেকের সন্তান বিদেশে- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডায় বসবাস করছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবার বাস্তবতা এক- পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, একাকী এবং অসহায় জীবন।
তিনি বলেন, শুধু এই আশ্রমই নয়, দেশের অধিকাংশ বৃদ্ধাশ্রমের চিত্র একই। এখানে বসবাসকারী প্রবীণরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত জীবন যাপন করেন। প্রতিদিন তারা ফেলে আসা পরিবারের কথা মনে করে কষ্ট পান, কাঁদেন, অভিমান করেন। এমনও ঘটনা ঘটে- ঈদের মতো উৎসবেও কেউ দেখতে আসে না। এমনকি কোনো প্রবীণের মৃত্যুর পর সন্তানের কাছে খবর দেয়া হলেও তারা লাশ নিতে আসেন না। এসব অসংখ্য ঘটনার নীরব সাী হয়ে আছে আশ্রমের প্রতিটি দেয়াল। ফলে আশ্রয়ের জায়গা হলেও অনেকাংশে এসব প্রতিষ্ঠান যেন প্রবীণদের হাহাকার আর বিষাদের এক নিঃশব্দ জাদুঘরে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারী একজন বলেন, বৃদ্ধাশ্রমে ঈদ মানেই বিষাদ, কান্না আর অপোর দিন। এখানে খাবার বা চিকিৎসার অভাব নেই, কিন্তু স্বজনের অভাবটাই সবচেয়ে বড় কষ্ট। তিনি জানান, অনেকেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রিয়জনের অপোয় থাকেন। কিন্তু দিন শেষে সেই অপো অপূর্ণই থেকে যায়। ঈদ এলেই এই বেদনা আরো তীব্র হয়ে ওঠে পুরনো স্মৃতির ভেতর হাতড়ে বেড়ান সবাই, আর বুকের ভেতর জমে ওঠা অভিমান নীরবে গিলে ফেলেন।
তার ভাষায়, অনেকেই চাইলেও আর বাড়ি ফিরতে চান না। কারণ যেভাবে তারা ঘর ছেড়ে এসেছেন, সেই অপমান ভুলে ফেরা তাদের কাছে অসম্ভব। তাই তারা আশ্রমের সহবাসীদেরই এখন নিজেদের পরিবার হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
একজন নারী প্রবীণ জানান, ঈদের সময় তারা একে অপরের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার চেষ্টা করেন ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর শূন্যতা থেকেই যায়। তবুও আশ্রমের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিরলস চেষ্টা করেন। বাসিন্দাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, চিকিৎসা, ওষুধ ও পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়। ঈদে নতুন কাপড় ও উন্নত খাবারের ব্যবস্থাও থাকে।
আরেকজন প্রবীণ তার জীবনের করুণ বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বলেন, তার সন্তানরা সবাই প্রতিষ্ঠিত- চাকরি ও ব্যবসায় সফল। স্ত্রীও ভালো চাকরি করতেন। কিন্তু দাম্পত্য কলহের জেরে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান। একসময় তিনিও বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়ে এই আশ্রমে আশ্রয় নেন। এর পর থেকে আর কেউ তাকে দেখতে আসেনি। তিনি বলেন, পরিবারের কথা খুব মনে পড়ে। ফিরতে চাই, কিন্তু সেই পথ আর খোলা নেই। তাই সব কষ্ট চেপে এখানেই দিন কাটাচ্ছি।
এই গল্পগুলো শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক পরিবর্তনের নির্মম প্রতিচ্ছবি। যেখানে আধুনিকতার দৌড়ে পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, আর সেই ভাঙনের ভার বইতে হচ্ছে সবচেয়ে অসহায় প্রবীণদের। তাদের নীরব কান্না আমাদের সমাজের কাছে এক গভীর প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- আমরা কি সত্যিই আমাদের শিকড়কে ভুলে যাচ্ছি?



