নির্বাচনে ভাগ হচ্ছে আ’লীগের ভোট

ব্যালটে নৌকা প্রতীক না থাকায় নেতাকর্মীদের ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য দলটির প্রধানের নির্দেশনা রয়েছে। তবে মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মাঠের চিত্রানুযায়ী আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি বা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও এসব এলাকার ভোটাররা এখন বিকল্প প্রার্থী খুঁজে নিতে চাইছেন। তাদের মনোভাব অনুযায়ী, এককভাবে কোনো দলই আওয়ামী লীগের ভোট পাচ্ছে না। অঞ্চলভেদে কর্মী-সমর্থকদের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠছে।

Printed Edition

মনিরুল ইসলাম রোহান ও এস এম মিন্টু

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একেবারে দরজায় কড়া নাড়ছে। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়ানোর পাশাপাশি ভোটারদের মনোভাবেও পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ ঝুঁকছেন ধানের শীষে, কেউ ঝুঁকছেন দাঁড়িপাল্লায়। এরই মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে পতিত আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে নানা সমীকরণ আলোচনায় রয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নৌকাবিহীন এবার নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে পতিত দলটির ভোটাররা কোন দিকে টার্ন করবে তা নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চলছে। অবশ্য দলীয় সূত্র বলছে, ব্যালটে নৌকা প্রতীক না থাকায় নেতাকর্মীদের ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য দলটির প্রধানের নির্দেশনা রয়েছে। তবে মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মাঠের চিত্রানুযায়ী আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি বা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও এসব এলাকার ভোটাররা এখন বিকল্প প্রার্থী খুঁজে নিতে চাইছেন। তাদের মনোভাব অনুযায়ী, এককভাবে কোনো দলই আওয়ামী লীগের ভোট পাচ্ছে না। অঞ্চলভেদে কর্মী-সমর্থকদের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার চিত্র ফুটে উঠছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দু’টি জরিপে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের ভোটারদের মধ্যে ৪৮.২ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে সমর্থন করার কথা জানিয়েছেন। আর ২৯.৯% ভোটার জামায়াতে ইসলামীর দিকে ঝুঁকছেন। তবে একটি বড় অংশ ভোটার কেন্দ্রে না যাওয়ার বা ভোট প্রদান থেকে বিরত থাকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

মাঠ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কেউ নিরাপত্তা সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন কেউ পতিত নেতাকর্মীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে বা দেখভাল করার আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। তবে পালিয়ে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ নেতাকর্মীদের ভাষ্য এবং সাধারণ ভোটারদের ভাষ্য কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ করা গেছে। গেল শনিবার ও গতকাল আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মীর সাথে আলাপ হয় নয়া দিগন্তের। কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা জামায়াতের চেয়ে বিএনপিকে নিরাপদ মনে করেন। তাদের ভাষ্য বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তাদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে কোনো ক্ষতি হবে না। এমনকি তাদের এবং পরিবারের নিরাপত্তা বিষয়টি বিবেচনায় বিএনপিকে ভোট দিবেন। অপর দিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভিন্ন চিন্তা কাজ করছে। বিশেষ করে মুসলিম নারী ও পুরুষ ভোটাররা এবার জামায়াতের দিকেই ঝুঁকছেন। কারণ জানতে চাইলে অনেকেই নয়া দিগন্তকে বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী যে মিথ্যা মামলা এবং হামলার ঘটনা ঘটেছে তা উদ্বেগের। বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকেও তারা আওয়ামী লীগের ট্যাগ দিয়ে ব্যবসায়ী এবং নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানিসহ চাঁদাবাজি করেছে। প্রতিবারই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছেন এবার তারা জামায়াতকে ভোট দিবেন। গতকাল বিকেলে পুরনো পল্টন মোড়ে চায়ের দোকানে কথা হয় ফরিদ হোসেনের সাথে (ছদ্মনাম)। তার বাড়ি কক্সবাজারে। ফরিদ স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত ছিলেন। তার পরিবার ভোট দেয়ার জন্য বাড়িতে যাওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু তিনি নৌকা প্রতীক না থাকায় তিনি ভোট দিতে বাড়িতে যাবেন না বলে জানান।

সম্প্রতি কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ পরিচালিত ওই জরিপের বলা হয়, আওয়ামী লীগের ভোটারদের মধ্যে ৪৮.২ শতাংশ বা প্রায় অর্ধেক ভোটার আসন্ন নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। জরিপে আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের মধ্যে ২৯.৯ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীকে এবং ৬.৫ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দিতে পারেন। ভোটারদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দুর্নীতি (৬৭.৩%) এবং ধর্মীয় চিন্তাভাবনা (৩৫.৯%) সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছে।

খুলনা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, নড়াইল ও কিশোরগঞ্জে ভোটের চিত্র : খুলনা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও কিশোরগঞ্জ জেলাকে আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে গোপালগঞ্জকে ধরা হয় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। পতিত দলটির প্রধান শেখ হাসিনার নিজ জেলা গোপালগঞ্জেও অন্যান্য জেলার মতো এবারই প্রথম ‘নৌকা’ প্রতীক ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এক সময় যেখানে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় পেত, সেখানে এখন বিএনপি, জামায়াত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পোস্টারে ছেয়ে গেছে দেয়াল। এসব এলাকাগুলোতেও এখন আওয়ামী লীগের ভোটাররাই অন্য প্রার্থীদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন। আওয়ামী অধ্যুষিত এসব এলাকায় আওয়ামী লীগের ভোটের দিকে নজর সব দলেরই। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা একটি বড় দলের নেতাকর্মীরা পতিত দলটির নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে তাদের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য। ভোট না দিলে এলাকাছাড়া করারও হুমকি দিচ্ছেন কেউ কেউ। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ওই দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মামলা দিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হয়রানি করেছেন, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আবার তাদের থানা থেকেও ছাড়িয়ে এনেছেন। এখন ওই দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, তাদের পক্ষে ভোট না দিলে এখন আর রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। আবারো মামলা দিয়ে ঘর ছাড়ার হুমকি-ধমকি দিয়ে এভাবে তাদের পক্ষে ভোট টানার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পাবনার সুজানগরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে একটি বড় দলের নেতাকর্মীরা তাদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য জোর করছে। হামলা-মামলাসহ নানা ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। ওই এলাকার ভোটাররা এখন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

সংখ্যালঘু ও হিন্দু ভোটারদের অবস্থান : আগামী নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ রয়েছে। খুলনা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও নড়াইলের মতো এলাকায় বেশি সংখ্যক হিন্দু ভোটার রয়েছেন। অনেকেই মনে করেন, সংখ্যালঘু মানেই আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে তাদের ভোট কোন বাক্সে পড়বে? বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এই ভোটারদের অনেকেই এখন বিএনপিকে বেছে নিতে পারেন। তবে আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এখন আওয়ামী লীগের পুরনো ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। খুলনা-১ আসনে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করেছে জামায়াত। দেশের বিভিন্ন জায়গায় জামায়াত হিন্দু শাখা রয়েছে। বিগত দিনে জামায়াত নেতা মাওলানা দেলোয়ার হুসাইন সাঈদী পিরোজপুরে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তেমনিভাবে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নিতাই চন্দ্র রায়ের মতো নেতৃবৃন্দ বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছেন। অতীতের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে আসছিল ভারত। আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে এবার ভারতীয় হাইকমিশন বিকল্প হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাদের মাধ্যমে বিএনপির পক্ষে হিন্দু ভোটগুলো টানার চেষ্টা করছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের বক্তব্য : গাজীপুরের সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট মো: জাহাঙ্গীর আলম শনিবার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এখনো নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়নি আসলে কার পক্ষে ভোট দিবো। তবে ত্রয়োদশ নির্বাচনকে আমরা মানি না। তবে এটাও ঠিক শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হলে কাউকে না কাউকে সাপোর্ট দিতে হবে। যদিও নির্বাচনের মাঠে এবার বিএনপি-জামায়াতের তীব্র লড়াই চলছে। এই লড়াইয়ে যারাই সরকার গঠন করবে সেই সরকার হবে আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভর করে। যে যেভাবেই জরিপ করুক শেষ পর্যন্ত আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার এক নির্দেশেই ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট প্রদান করবেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, বিএনপি তাদের জন্য নিরাপদ। পতিত দলটির সহযোগী সংগঠন কৃষকলীগের নেতা সামিউল বাসীর বিন সামী বলেন, নেত্রীর নির্দেশ, তাই ভোটকেন্দ্রে যাব না, ভোটও দেবো না। নৌকা প্রতীক নাই, ভোটও নাই। মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা মো: মিরাজ হোসেন বলেন, কেন্দ্র আওয়ামী লীগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। কে কাকে নির্দেশনা দেবে। শীর্ষ নেতৃত্বের কেউইতো ভোট দিতে যেতে পারবেন না নানা কারণে, নানা ঝুঁকি আছে। তৃণমূল পর্যায়ের ভোট অঞ্চলভেদে ভাগ হবে। এলাকায় যেসব প্রার্থী প্রভাবশালী, যেসব প্রার্থী নেতাকর্মীদের শান্তিতে বসবাস করার নিশ্চয়তা দিতে পারবেন, ব্যবসাবাণিজ্য নির্বিঘেœ চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করবেন সেই প্রার্থীর পক্ষেই ভোট পড়বে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যা বলছেন : একাধিক গেয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট কোথায় যাচ্ছে। এরই মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ে জরিপ করেছে। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে মোট ভোটার ৩৫ শতাংশ। তার মধ্যে কট্টর দলীয় ভোট রয়েছে ১৫ শতাংশ। এই ১৫ শতাংশ ভোটার ভোট কেন্দ্রে গেছে পুরোপুরি তারা বিএনপির পক্ষে এবং না ভোটের পক্ষে ভোট দিবেন। ২০ শতাংশ রয়েছে সাধারণ ভোটার। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে ১০ শতাংশ বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত। ওই সূত্র আরো জানায়, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় দিক হলো ভোট বিড়ম্বনা। গণভোট ও সাধারণ ভোটের জালে এবার খোদ ভোটাররাই আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন- প্রতি ভোটার ভোটকক্ষে ভোট দিতে সময় লাগবে ন্যূনতম ১ মিনিট ৯ সেকেন্ড। অর্থৎ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একই সময় নিবে। ৪টার আগে যারা কেন্দ্রে প্রবেশ করবেন তাদের সময় লাগবে ৫৫ সেকেন্ড। কারণ ওই সময়টা খুব তাড়াহুড়ো করে ভোটের কার্যক্রম শেষ করার তাগিদ রয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, এই সময়ের মধ্যে ভোটারদের বিপুল উপস্থিতি থাকলেও ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের কম ভোটাররা ভোট প্রয়োগ করতে পারবেন। অনেকেই বিরক্ত হয়ে ভোটকেন্দ্র থেকে চলে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।