আওয়ামী লীগ বিরোধী হওয়ায় প্রশাসন ক্যাডারের বহু কর্মকর্তা শেখ হাসিনার আমলে দীর্ঘ দিন পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন। ব্যাচমেটরা সচিব পদে উন্নীত হলেও এসব কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী সচিব/উপসচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর ওই সব কর্মকর্তা পরপর তিনটি পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব হন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকজনকে দিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদায়ন করেন। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর এমন কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ফলে সেই বঞ্চিত কর্মকর্তারা বঞ্চিতই থাকছেন। অথচ একই সময়ে আওয়ামী সুবিধাভোগী একাধিক সচিবকে প্রত্যাহার করে আবার সেই প্রত্যাহার আদেশ বাতিল করা হয়। অন্য দিকে আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের পদায়ন করে বির্তকের পর পদায়নের আদেশ বাতিল করা হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হওয়ায় গত ২৫ মার্চ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক; বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। একই সাথে তাদের পদে অন্য তিনজন সচিব নিয়োগ করা হয়। পরে এক দিনের মধ্যে এই তিন সচিবের বদলি আদেশ স্থগিত করে নতুন নিয়োগ পাওয়া তিন সচিবের আদেশ বাতিল করা হয়।
সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, অধিদফতর ও সংস্থার প্রধান, এসপিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বদলি, পদায়ন কিংবা নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর বিতর্কের মুখে দুই মাসে অন্তত ১৫ জনকে প্রত্যাহার করেছে সরকার। প্রভাবশালী মহলের তদবিরের চাপে তাড়াহুড়া করে প্রজ্ঞাপন দেয়ায় এ ঘটনা ঘটছে।
আবদুর রশীদ মিয়াকে ২৪ মার্চ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। নিয়োগের পাঁচ দিন পর তার নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে থাকার সময় তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে আবদুর রশীদ মিয়ার অনিয়ম-দুর্নীতি বিষয়ে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গাজীপুরের বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক পদে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির দু’দিনের মাথায় তা বাতিল করে কৃষি মন্ত্রণালয়। গত ৩ মে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামকে মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আনিসুর রহমানকে। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই সে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
৫ মে দেশের ১২ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) পদে রদবদল আনা হয়। বিতর্ক তৈরি হওয়ায় তাদের মধ্যে তিনজনকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ৯ মে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের আলাদা দুই আদেশে ফেনীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান ও পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মো: মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর নিয়োগ দেয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় মৌলভীবাজারের এসপি মো: রিয়াজুল ইসলামকেও প্রত্যাহার করা হয়। এসব আদেশে প্রত্যাহারের কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে তাদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করে সংবাদ প্রকাশ হয়।
১০ মার্চ শিক্ষামন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান। এই নিয়োগের পর কয়েকজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফেসবুকে লেখেন, তিনি ১৭ বছর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেছেন। পত্রিকার লেখাগুলোও ফেসবুকে জুড়ে দেয়া হয়। এরপর গত ১৪ মে তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। ওমর ফারুক দেওয়ান তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা। এর পরও তাকে একই দিন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তার পদ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এই নিয়োগ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠায় গত মঙ্গলবার ওমর ফারুক দেওয়ানের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক পদে পদায়নের আদেশও বাতিল করা হয়েছে।
গত সোমবার সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো: মিজানুর রশীদকে নির্বাহী পরিচালক (ইডি) পদে পদোন্নতি দেয়ার পর বিকেল গড়াতেই- সেই আদেশ বাতিল হয়ে যায়।



