সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি

বৃষ্টিতে কমেছে সবজির সরবরাহ বাড়ছে বেকারি পণ্যের দাম

Printed Edition
শান্তিনগর কাঁচাবাজারে সবজির অভাব নেই। কিন্তু দাম চড়া : নয়া দিগন্ত
শান্তিনগর কাঁচাবাজারে সবজির অভাব নেই। কিন্তু দাম চড়া : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামে স্বস্তি ফিরছে না। সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। অনেক খুচরা দোকানে বোতলজাত তেল মিলছে না। এর মধ্যে আটা ও ময়দার দাম বেড়েছে। বাড়তি উৎপাদন খরচের কারণে আজ (শনিবার) থেকে বেকারি পণ্যের দামও বাড়ানোর ঘোষণা এসেছে। একই সাথে ডিম, মাছ ও মুরগির দামও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এ দিকে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সবজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেড়েছে বেশির ভাগ সবজির দামও। এমন পরিস্থিতিতে চাল-ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের সাথে নতুন করে তেল, আটা-ময়দা, মাছ-গোশত ও সবজির বাড়তি দাম নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সংসার ব্যয়ে চাপ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

গতকাল (শুক্রবার) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। অনেক মুদি দোকানে তেল না থাকায় ক্রেতাদের ফিরে যেতে হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানির কাছে অর্ডার দেয়ার পরও চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। কোথাও কোথাও অর্ডার দেয়ার কয়েক দিন পর তেল পাওয়া যাচ্ছে।

মিরপুর-১১ কাঁচাবাজারের মুদি দোকানি তামিম বলেন, অর্ডার দিলেও কোম্পানি তেল দিচ্ছে না। দোকানে সয়াবিন তেল নেই। তেল কিনতে এসে অনেক ক্রেতাকেই খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। একই বাজারে আরেক দোকানি বলেন, পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ার পাশাপাশি খুচরা বিক্রিতে লাভও খুবই কম। এক লিটার তেল ১৯৮ টাকা দরে কিনে ১৯৯ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে তেল বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের তেমন লাভ থাকছে না।

সম্প্রতি সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে পাঁচ টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দেয়। ব্যবসায়ীরা ১০ টাকা বাড়ানোর দাবি করলেও সরকার পাঁচ টাকা বাড়ানোর অনুমতি দেয়। এরপর ২ সেপ্টেম্বর থেকে কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের নতুন দাম প্রতি লিটার ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে। তবে দাম বাড়ানোর পরও বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ খুচরা বিক্রেতাদের।

এ দিকে আটা ও ময়দার দামও বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্লেষণের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি খোলা আটা ৪৮ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে এর সর্বনিম্ন দাম ছিল ৪৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আটার দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ।

খোলা ময়দার দামও বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন তা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। প্যাকেটজাত ময়দা প্রতি কেজি ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা। আটা-ময়দার বাড়তি দামের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বেকারি-শিল্পে। বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি জানিয়েছে, আজ (শনিবার) থেকে সবধরনের বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয় করা হবে।

সংগঠনের সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়বে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে দাম একই রেখে ওজন কমিয়ে দেয়া হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ১০ টাকার রুটির দাম ১০ টাকা থাকলেও আগে ৪০০ গ্রাম থাকলে তা কমিয়ে ৩৫০ বা ৩২০ গ্রাম করা হতে পারে।

তিনি বলেন, তেলের দাম অনেক বেড়েছে। এর সাথে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা এবং অন্যান্য খরচও রয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে দাম সমন্বয় ছাড়া উপায় নেই। এ দিকে মাছ, মুরগি ও ডিমের বাজারেও স্বস্তি নেই। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ডজন-প্রতি ডিম ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে যা ছিল ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডজন-প্রতি ডিমের দাম বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা।

ব্রয়লার মুরগি বাজারভেদে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগি ৩১০ থেকে ৩২০ টাকা, হাইব্রিড ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি প্রায় ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কিছু বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় মুরগির দাম সামান্য কমলেও তা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এখনো স্বস্তিদায়ক নয়।

বিভিন্ন বাজারে বিক্রেতারা বলছেন, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমের কারণে বিভিন্ন খামারে ডিমপাড়া মুরগি ও ব্রয়লার মারা গেছে। পরে অনেক খামারি নতুন করে মুরগি পালন শুরু করেননি। এর সাথে সাম্প্রতিক লোডশেডিং পরিস্থিতিও খামারে উৎপাদন ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এসব কারণে ডিম ও মুরগির সরবরাহে চাপ তৈরি হয়ে দাম বাড়তি রয়েছে।

মাছের বাজারেও দামের বড় কোনো পতন নেই। পাঙ্গাশ প্রতি কেজি প্রায় ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, রুই ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ট্যাংরা প্রায় ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, দেশী কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং শোল ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের চিংড়ির দাম ৮০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। সাগরের মাছের ক্ষেত্রে কেজি-প্রতি দাম হাজার টাকার ওপরে চলে যাচ্ছে।

দুয়ারীপাড়া বাজারে মাছ কিনতে আসা মৌসুমি আখতার বলেন, মাসিক বাজারের জন্য রুই, শিং ও টেংরা মাছ কিনেছেন। তিন ধরনের মাছ কিনতেই প্রায় এক হাজার ৬০০ টাকা খরচ হয়েছে। তার কাছে প্রতি কেজি মাছের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি মনে হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তুলনামূলক কম দামের পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়াও এখন ব্যয়ের চাপ তৈরি করছে। এক দিনমজুর আবুল হোসেন বলেন, আগে পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়া কিনতেন। এখন সেগুলোর দামও বেড়ে গেছে। দিন দিন দাম বাড়লেও কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

সবজির বাজারেও কয়েক দিনের বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন সবজির দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে গোল বেগুন সর্বোচ্চ ১৪০ টাকা এবং লম্বা বেগুন ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। বরবটি ১২০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, পটোল ৮০ টাকা, ঝিঙা, ধুন্দুল ও চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, শসা ৮০ টাকা এবং টমেটো ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গাজর ১৪০ টাকা, কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৬০ টাকা, কচু ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৬০ টাকা এবং লাউ ৬০ থেকে ৭০ টাকা পিস দরে বিক্রি হচ্ছে। আগাম শিমের দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে। তবে পেঁপে তুলনামূলক কম দামে, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।

মিরপুর-৬ নম্বর বাজারের সবজি বিক্রেতা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বাজারে সবজির সরবরাহ কিছুটা কমেছে। পাইকারি বাজারে প্রায় সবধরনের সবজির দাম বেড়েছে। বৃষ্টি থেমে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দাম কিছুটা কমতে পারে। একই বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী জাহিদুর রহমান বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় এবার প্রায় সব সবজির দামই বেশি মনে হচ্ছে। একসাথে এত পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সংসারের বাজার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো। কারণ তাদের খাদ্যতালিকায় তুলনামূলক কম দামের ডিম, ব্রয়লার মুরগি, পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া, আটা ও বিভিন্ন মৌসুমি সবজির ওপর নির্ভরতা বেশি। এসব পণ্যের দাম একসাথে বৃদ্ধি পাওয়ায় খাবারের ব্যয় কমানোর জন্য অনেক পরিবারকে মাছ-গোশতের পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। কেউ কেউ বেকারি পণ্যসহ অন্যান্য খাবারও কম কিনছেন।

পল্লবী বাজারের ক্রেতা শরিফুদ্দিন বলেন, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ সাধারণত ডিম ও মুরগির মাধ্যমে আমিষের চাহিদা মেটান। এখন এই দুই পণ্যের দামও বাড়তি। তার ওপর তেল, আটা-ময়দার দাম বেড়েছে। চাল, ডালসহ অন্যান্য খরচও বেশি। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

এ দিকে বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু একটি বা দু’টি পণ্যের দাম নয়- জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব একসাথে বাজারে পড়ছে। ফলে এক পণ্যের বাড়তি ব্যয় অন্য পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সাথে বৃষ্টি বা সরবরাহ ঘাটতির মতো সাময়িক কারণ যুক্ত হলে বাজারে দাম আরো বেড়ে যাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহ সঙ্কট কাটেনি, আটা-ময়দার মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর পথ তৈরি করেছে, আর ডিম-মুরগি, মাছ ও সবজির বাড়তি দাম খাদ্য ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। বাজারে সরবরাহ ও দাম- দুই ক্ষেত্রেই স্থিতিশীলতা না ফিরলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।