সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই দেশে আসছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২৫ ডিসেম্বর তিনি লন্ডন থেকে বাংলাদেশে আসবেন। দেড় যুগ পর তার এই দেশে ফেরার ঘটনাকে অবিস্মরণীয় করে রাখতে ইতোমধ্যেই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। শুধু ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা নয়, তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে সারা দেশ থেকেই নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসবেন। বিমানবন্দর এলাকাসহ গোটা ঢাকা সেদিন জনসমুদ্রে পরিণত হবে বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা।
তারা জানান, তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে এতদিন নানান গুজব-গুঞ্জনে অনেক নেতাকর্মী আশাহত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি আদৌ আসবেন কি না, কবে আসবেন তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি ছিল অনেকের মধ্যে। তবে এবার দল থেকে তার দেশে ফেরার ঘোষণায় নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা ফিরে এসেছে।
দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, আগামী নির্বাচনকে তারা অনেক কঠিন বলে মনে করছেন। এই নির্বাচনের আগে প্রিয় নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তাদের মধ্যে যেমন সাহস সঞ্চার করবে তেমনি তাদেরকে আরো বেশি গতিশীল করবে। পুরো নির্বাচনী মাঠের চিত্রও পাল্টে যাবে, সারা দেশে বিএনপির পক্ষে জোয়ার বইবে বলে দলটির নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘটনাকে ঐতিহাসিক করতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, তারেক রহমান যেদিন বাংলাদেশে পা দেবেন, সেদিন যেন সারা বাংলাদেশ কেঁপে ওঠে। সেদিন গোটা বাংলাদেশের চেহারা বদলে দিতে চায় বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফিরবেন- সেদিন থেকেই নির্বাচনের সবকিছু প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। তিনি দেশে আসার মধ্য দিয়েই বিএনপির নির্বাচনের কাজ অর্ধেক শেষ হয়ে যাবে। প্রচারণা নির্বাচনের মূল বিষয়, সেদিন বিএনপির অর্ধেক প্রচারণা হয়ে যাবে। তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হবে বলেও তিনি জানান।
এ দিকে তারেক রহমানের দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার পর থেকে এক দিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাকর্মীরা নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন তেমনি ওই দিন ঢাকা আসার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শামসুল আলম রিপন নয়া দিগন্তকে বলেন, তারেক রহমান তাদের আবেগ আর ভালোবাসার জায়গা। এটা তাদের অনুভূতি। তাদের এই প্রিয় নেতার প্রত্যাবর্তনের দিনে তিনি নিজে যেমন ঢাকায় থাকবেন তেমনি তার সংগঠনের একেবারে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায় থেকেও নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি এরই মধ্যে নিতে শুরু করেছেন।
বরগুনার বেতাগী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান কবির নয়া দিগন্তকে বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের ঢাকায় নিতে যেমন তাদের প্রস্তুতি নেয়া লাগত এবার আর তার প্রয়োজন হবে না। দলের প্রত্যেক স্তরের নেতাকর্মীরা স্বপ্রণোদিতভাবে ঢাকায় ছুটে যাবেন।
কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইফুর রহমান নয়ন নয়া দিগন্তকে বলেন, জিয়া পরিবার তাদের আবেগের স্থান। এই পরিবারের প্রতি শুধু বিএনপি নয়, সারা দেশের মানুষের ভালোবাসা আর আস্থা রয়েছে। ওই দিন শুধু দলের নেতাকর্মী নয়, সাধারণ জনগণও তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করতে, প্রিয় নেতাকে বরণ করতে ঢাকার রাজপথে ছুটে চলবেন।
উল্লেখ্য, দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে ওয়ান-ইলেভেনে একের পর এক মিথ্যে মামলায় কারাগারে যেতে হয়েছিল তারেক রহমানকে। পরে জামিনে মুক্তি নিয়ে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় চিকিৎসার জন্য স্ত্রী ডা: জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে সাথে নিয়ে লন্ডনে যান তিনি। ওই সময় থেকে লন্ডনে অবস্থান করছেন। লন্ডনে থেকেই তিনি বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আরো অর্ধশতাধিক মামলায় জড়ানো হয় তাকে। একুশে আগস্ট মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলায় তাকে সাজাও দেয়া হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সবকিছু পাল্টে যেতে থাকে। তখন থেকেই তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে নেতাকর্মী ছাড়াও দেশের সবার মধ্যে আলোচনা চলছিল। বিভিন্ন সময়ে দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারেক রহমান যেকোনো সময়ে দেশে ফিরবেন।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও তারেক রহমান দেশে ফিরছেন না কেন- এই প্রশ্ন ও কৌতূহল ক্রমে জোরালো হতে থাকে। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও তার না ফেরার ঘটনায় নানান সমালোচনার জন্ম হয়। এ সময়ে তারেক রহমান নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে তার অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন- ‘এমন সঙ্কটকালে মায়ের স্নেহ-স্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা যেকোনো সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।’
তারেক রহমানের ওই স্ট্যাটাসের পর থেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে তার নিরাপত্তার বিষয়টি। দেশের মধ্যে ও বাইরে নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিএনপির কয়েকজন নেতা নয়া দিগন্তকে বলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার সাথে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অনেক সিদ্ধান্তও জড়িত। বিশেষ করে ক্ষমতাধর বিভিন্ন রাষ্ট্র ছাড়াও প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের সাথে তার সুসম্পর্ক আরো জোরদার করতে হয়েছে। এটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দলের কূটনৈতিক শাখার দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা কাজ করছেন। সেখানে ইতিবাচক অনেক সফলতা আছে। এসব কিছুকে সমন্বয় করে তারেক রহমান দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। আশা করছি- সবকিছু ঠিক থাকলে নির্ধারিত দিনেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। সারা দেশ সফরের মাধ্যমে এক দিকে যেমন দলকে সুসংগঠিত করবেন তেমনি পুরো জাতিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হবেন।
দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারেক রহমানের দেশে ফেরার জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তুতি কিংবা কমিটি গঠন হয়নি এখনো। তবে শিগগির এসব প্রস্তুতি নেয়া হবে। যদিও নেতারা বলছেন, কোনো প্রস্তুতি নেয়ার তেমন দরকার নেই। দলের পক্ষ থেকে তেমন নির্দেশনারও দরকার নেই। জিয়া পরিবারের প্রতি এ দেশের মানুষের ভালোবাসা, আস্থা আর বিশ্বাসের কারণেই সেদিন জনতার বাঁধভাঙা জোয়ার সৃষ্টি হবে। দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা নিজ উদ্যোগেই সেদিন ঢাকামুখী হবেন তাদের প্রিয় নেতাকে বরণ করে নেয়ার জন্য। তবে চেষ্টা করা হবে, জনতার ঢলে যেন তাদের নেতার নিরাপত্তায় কোনো বিঘœ না ঘটে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারেক রহমানের নিরাপত্তায় সরকারের পাশাপাশি দলীয়ভাবেও তারা উদ্যোগ নেবেন।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ, স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতীক। বহুমাত্রিক সংগ্রামের সাথে অসীম ধৈর্য, নির্যাতন আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবিচল থাকার উদাহরণ তিনি। জাতির দুঃসময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে তিনি আশার আলো ও ঐক্যের প্রতীক। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভদ্রতা, নৈতিকতা ও সৌজন্যবোধ ফিরিয়ে আনার নিরন্তর আপসহীন সংগ্রামী নেতা। বিএনপি ও বাংলাদেশের একজন অপরিহার্য রাজনীতিক। প্রায় ১৭ বছর তিনি যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে তার দেশে ফেরার ঘটনা অত্যন্ত তাৎপর্যমূলক ও ঐতিহাসিক। এ দিনটিকে তারা ঐতিহাসিকভাবেই পালন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, জাতীয়তাবাদের কান্ডারি তারেক রহমান দেশে ফিরছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর এ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তার জন্য যে তীব্র আকাক্সক্ষা, অপেক্ষা- তার অবসান ঘটবে এর মধ্য দিয়ে। সুতরাং ওইদিন যে পরিস্থিতিই হোক না কেন- লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থক তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে রাজধানীতে জড়ো হবেন। দিনটি দেশের জন্য ঐতিহাসিক দিন হবে।
তারেক রহমান দেশে ফিরে কোথায় উঠবেন এবং কোথায় অফিস করবেন, তাও অনেকটা চূড়ান্ত। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নিরাপত্তার বিষয় নিয়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সাথে বৈঠক করেছে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল। এ ছাড়া খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রেখে দু’টি বুলেটপ্রুফ বাস ও গাড়ি কেনার উদ্যোগ সম্পন্ন করেছে দলটি। এই গাড়ি কেনার অনুমতি দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে গাড়ি চলে এসেছে বলে দাবি সূত্রের।
দলীয় সূত্র আরো বলছে, গুলশান-২-এর ‘ফিরোজা’ ভবনে থাকেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এর পাশের ১৯৬ নম্বর বাড়িটি ১৯৮১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর তৎকালীন সরকার তার স্ত্রী খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেয়। গত বছর অন্তর্র্বর্তী সরকার গুলশান-২ অ্যাভিনিউ রোডের ১৯৬ নম্বর বাড়ির নামজারি সম্পন্ন করে এ সংক্রান্ত কাগজপত্র বিএনপি চেয়ারপারসনের হাতে হস্তান্তর করে। দেশে ফিরে এই বাড়িতেই থাকার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়েই অফিস করবেন তারেক রহমান। এ জন্য তার বসার উপযোগী করেই কক্ষটি সাজানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আগে গুলশান-২-এর ফিরোজায় উঠতে পারেন।



