মেঘনা নদীতে দুই লঞ্চের সংঘর্ষ : নিহত বেড়ে ৭

রুট পারমিট বাতিল হতাহতদের অনুদানের ঘোষণা

Printed Edition
সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত একটি লঞ্চের ভেতরের অংশ : নয়া দিগন্ত
সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত একটি লঞ্চের ভেতরের অংশ : নয়া দিগন্ত

চাঁদপুর প্রতিনিধি

চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে জাকির সম্রাট-৩ ও অ্যাডভেঞ্চার-৯ নামে দুই লঞ্চের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে সাত যাত্রী নিহত হয়েছেন। আহত হন অর্ধশতাধিক। বৃহস্পতিবার রাত ২টার দিকে চাঁদপুর সদরের হরিণা এলাকায় মেঘনা নদীতে ঘন কুয়াশার কারণে এ ঘটনা ঘটে। পরে অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটির চারজন স্টাফকে আটক করেছে ঝালকাঠির পুলিশ। এ ছাড়া লঞ্চ দু’টির রুট পারমিট বাতিল করেছে বিআইডব্লিউটিএ।

দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চের হতাহত যাত্রীদের ঢাকার সদরঘাটে নেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সদরঘাট নৌ থানার কর্মকর্তা সোহাগ রানা গণমাধ্যমকে বলেন, লঞ্চে সংঘর্ষের ঘটনায় সাতজনের লাশ পাওয়া গেছে।

নৌ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এ ঘটনায় নিহতদের মধ্যে এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের চারজন রয়েছেন। তারা হলেন আ: গনি (৩৮) বাবা সিরাজুল ব্যাপারী, মো: সাজু (৪৫) বাবা মো: কালুখা, মো: হানিফ (৬০) বাবা আমির হোসেন, মোসা: রিনা (৩৫) বাবা মৃত মোক্তার হোসেন সামী মিলন। এদের সবার বাড়ি ভোলায়।

এর আগে চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (ট্রাফিক) বাবু লাল বৈদ্য জানান, চাঁদপুর সদরের হরিণা এলাকায় মেঘনা নদীতে দুই লঞ্চের সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই দু’জন নিহতসহ বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোলার ঘোষেরহাট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা অভিমুখী এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি রাত ২টার পর হাইমচর নৌ এলাকা অতিক্রম করছিল। একই সময়ে ঢাকা থেকে বিএনপির গণসংবর্ধনায় আসা যাত্রীদের নিয়ে যাচ্ছিল বরিশালগামী এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯। এ সময় নদীতে প্রচণ্ড ঘন কুয়াশা থাকায় দিক নির্ণয় করতে না পেরে অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি জাকির সম্রাট-৩-কে ধাক্কা দেয়। যাত্রীরা জানান, কুয়াশার ভেতরেও অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি বেপরোয়া গতিতে ছিল। সংঘর্ষের পর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলেও লঞ্চটি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

দুর্ঘটনায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত জাকির সম্রাট-৩ যখন মাঝ নদীতে ডুবো ডুবো অবস্থায় ভাসছিল, তখন ভোলা থেকে ঢাকাগামী এমভি কর্ণফুলী-৯ নামে অপর একটি লঞ্চ দ্রুত এগিয়ে আসে। তারা অনেক যাত্রীকে উদ্ধার করে ঢাকায় নিয়ে আসে।

নৌ পুলিশের অঞ্চল কর্মকর্তা আরো জানান, এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চটি ঢাকার সদরঘাট নৌ টার্মিনালে পৌঁছালে সদরঘাট নৌ থানার পুলিশ নিহতদের লাশ উদ্ধার করে এবং আহতদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অন্য দিকে এমভি এডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ঝালকাঠির নৌঘাটে পৌঁছানোর পর লঞ্চটির চারজন স্টাফকে আটক করা হয়।

অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চ বেপরোয়া গতিতে চলছিল

চরফ্যাসন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, দুই লঞ্চের সংঘর্ষের ঘটনায় নৌপথে চলাচলকারী যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে নৌ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের মালিক জাকির মিয়া জানান, নদীতে প্রচণ্ড কুয়াশা থাকায় আমাদের লঞ্চটি স্বাভাবিক গতিতে চললেও অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি বেপরোয়া গতিতে ছিল। সংঘর্ষের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলেও অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চটি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

দুই লঞ্চের রুট পারমিট বাতিল

নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, মেঘনা নদীতে এমভি অ্যাডভেঞ্চার-৯ ও এমভি জাকির সম্রাট-৩ লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ দু’টির রুট পারমিট বাতিল করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মেরিন কোর্টে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সাংবাদিকদের এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান রিয়াল অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতেই লঞ্চ দু’টির রুট পারমিট সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে মেরিন কোর্টে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।

হতাহতদের জন্য অনুদানের ঘোষণা

বাসস জানায়, নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার রাজধানীর সদরঘাটে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি। এ সময় বস্ত্র ও পাট এবং নৌ পরিবহন উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। সব ধরনের পরিবহনের মধ্যে নদীপথ তুলনামূলক নিরাপদ। তার পরও এ ধরনের দুর্ঘটনা মেনে নেয়া যায় না।

উপদেষ্টা জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আট সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সাথে ঘটনার সাথে জড়িত দুই লঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্তদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে। তিনি আরো জানান, ইতোমধ্যে কয়েকটি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাতে কুয়াশার মধ্যে কোনো লঞ্চ চলাচল করতে পারবে না। রাতে কোথাও দাঁড়ালে অবশ্যই লাইট ব্যবহার করতে হবে। এ মৌসুমে বাল্কহেড সকাল ৮টার আগে চলাচল করতে পারবে না। এসব নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করা হবে। নৌ উপদেষ্টা বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঝড় বা তুফানে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু যেভাবে দু’টি লঞ্চের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, তাতে মনে হয় চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন অথবা অন্য কাউকে দিয়ে লঞ্চ চালাচ্ছিলেন। তবে তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাবে না। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো লঞ্চচালক সঠিকভাবে লঞ্চ পরিচালনা না করলে, রাতে লাইট ব্যবহার না করলে বা নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিল করা হবে।