বুটেক্সে স্বপ্ন বোনার প্রথম মাস

শেফাক মাহমুদ, বুটেক্স
Printed Edition
বুটেক্সে স্বপ্ন বোনার প্রথম মাস
বুটেক্সে স্বপ্ন বোনার প্রথম মাস

সকাল ৮টার ক্লাস। কিছুক্ষণ আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস এসে থেমেছে বুটেক্স ক্যাম্পাসে। কারো চোখে ঘুমের রেশ, কেউ দ্রুত পা বাড়াচ্ছেন ক্লাসরুমের দিকে। হঠাৎ শোনা গেল, ‘আসসালামু আলাইকুম ভাই।’ উত্তরটা আসতে দেরি হয় না, ‘আরেহ, ব্যাচমেট, ব্যাচমেট!’

মাত্র এক মাস আগেও দৃশ্যটা এমন ছিল না। কে সিনিয়র, কে সহপাঠী, চেনারই সুযোগ হয়নি। এখন সে অপরিচিত মুখগুলোই ক্যাম্পাস জীবনের নিত্যদিনের সাথী। কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে, কেউ হয়ে উঠেছেন বড় ভাই-আপু, আবার কারো সাথে চলছে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপ। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম ব্যাচের প্রথম এক মাস যেন এভাবেই কেটে গেছে নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, প্রত্যাশা, বিস্ময় আর বাস্তবতার মিশেলে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ইশরাত জাহান এলিনার কাছে এ সময়টা শুধু নতুন ক্যাম্পাসে মানিয়ে নেয়ার নয়, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারেরও। প্রথম ক্লাসগুলোতেই পরিচিত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা নিয়মকানুন ও অ্যাকাডেমিক বাস্তবতার সঙ্গে। তবে তার প্রত্যাশা আরো বড়, বুটেক্সে শুধু একজন ইঞ্জিনিয়ার নয়, একজন পরিণত মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে চান তিনি। নতুন মানুষের সাথে মিশতে, নিজের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে চান।

মাহির আবরারের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের ছিল ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠান। ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এ শিক্ষার্থী কখনো ভাবেননি, নবীনদের বরণ করে নিতে একজন শিক্ষামন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। বিষয়টি তাকে একই সাথে আনন্দিত ও গর্বিত করেছিল। কিন্তু এরপর যখন একের পর এক ক্লাস ক্যানসেল হচ্ছিল, তখন মনে হয়েছিল, ‘এ কোথায় পড়তে আসলাম!’ এক মাস পর সে চিত্র পাল্টে গেছে। এখন পড়ার চাপ এত বেশি যেকোনো ক্লাস ক্যানসেল হলে; বরং স্বস্তি লাগে।

বুটেক্সে আসার আগে তেমন প্রত্যাশাই ছিল না সানজিদা তাবাচ্ছুমের। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এ শিক্ষার্থী এখন অবশ্য বুটেক্সে পড়ার সুযোগকে নিজের বড় অর্জন মনে করছেন। নতুন মানুষ, সংগঠন, ল্যাব, ক্লাস আর বন্ধুদের সাথে মিশতে গিয়ে নিজের মধ্যেই পরিবর্তন দেখছেন তিনি। আগের চেয়ে আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল মনে হচ্ছে নিজেকে। ছোট ক্যাম্পাসে সহজে সবার সাথে মিশে যাওয়াটাও তার কাছে একধরনের প্রাপ্তি। শিক্ষকদের ক্লাস, ল্যাব আর বন্ধুদের সাথে আড্ডায় দ্রুতই মানিয়ে নিয়েছেন তিনি।

তবে এক মাসে প্রাপ্তির পাশাপাশি নতুন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে। ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৌফিকুর রহমান চান, বিভাগীয় অনুষ্ঠান, কেন্দ্রীয় উৎসব, সাংস্কৃতিক আয়োজন, খেলাধুলা ও বিভিন্ন কো-কারিকুলার কার্যক্রমের মাধ্যমে আরো প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস। তার মতে, এমন আয়োজন শুধু বিনোদন নয়; এতে সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কও আরো দৃঢ় হবে।

অন্য দিকে, কিছু অপূর্ণতাও চোখে পড়েছে নবীনদের। অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৌফিক হাসান মিরাজের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে অ্যাকাডেমিক চাপ, ল্যাবের অপ্রতুল ও অকার্যকর যন্ত্রপাতি, শ্রেণীকক্ষে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং শিক্ষকদের পাঠদানের মান নিয়ে অসন্তোষ। রুটিনের বাইরে ক্লাস নেয়া নিয়েও তার আপত্তি রয়েছে। তার প্রত্যাশা, শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে ল্যাব, শ্রেণীকক্ষ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধার উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় আরো গুরুত্ব দেবে।

তবে ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে অভিজ্ঞতা একেবারে নির্ভার নয়। অধিকাংশ সিনিয়র আন্তরিক ও সহযোগিতাপরায়ণ হলেও র‌্যাগিংয়ের কিছু ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ছাত্র রাজনীতির উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। নবীনদের প্রত্যাশা, ক্যাম্পাস হবে শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও রাজনীতিমুক্ত, যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থাকবে।

মাত্র এক মাসে বুটেক্সকে পুরোপুরি চেনা সম্ভব নয়। তবে এ এক মাসেই ৫২ ব্যাচ বুঝতে শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস, পরীক্ষা আর ল্যাব নয়; এটি নিজেকে গড়ে তোলারও সময়। তাই প্রথম মাসের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি পেরিয়ে তাদের প্রত্যাশা এখন একটাই, আগামী চার বছর যেন বুটেক্স তাদের প্রকৌশলী হওয়ার পাশাপাশি একজন দক্ষ ও পরিণত মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়।