বাংলাদেশের নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানিগুলোতে (অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান) আমানত ও ঋণ কার্যক্রমে একদিকে সম্প্রসারণ, অন্যদিকে সতর্কতার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে আমানতকারী ও আমানতের পরিমাণ বেড়েছে, তবে ঋণগ্রহীতা ও ঋণ হিসাবের সংখ্যা কমেছে। এই প্রবণতা অর্থনীতিতে ঝুঁকি-সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রক্ষণশীল নীতির প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকারিতা হারাতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত বর্তমানে একটি সতর্ক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমানত বাড়ছে, মানুষ সঞ্চয়ে আগ্রহী হচ্ছে; কিন্তু ঋণ বিতরণে প্রতিষ্ঠানগুলো আরো হিসাবি ও রক্ষণশীল হচ্ছে। গ্রাম-শহর বৈষম্য, নারী অংশগ্রহণ এবং যুব উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, এই তিন ক্ষেত্রেই নীতিগত মনোযোগ বাড়ানো গেলে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত ভবিষ্যতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী পরিপূরক হিসেবে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
অপরিবর্তিত প্রতিষ্ঠান ও শাখা, বাড়ছে হিসাব : ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যরত অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান-এর সংখ্যা ছিল ৩৫টি, যা জুন ২০২৫-এর মতোই অপরিবর্তিত। রিপোর্টকৃত শাখার সংখ্যাও স্থির রয়েছে ৩০০টিতে। তবে সীমিত প্রতিষ্ঠান কাঠামোর মধ্যেই গ্রাহক হিসাব ও লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান-এ মোট আমানত হিসাব দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার ৮২৫টি, যা জুন ২০২৫-এ ছিল চার লাখ ৮০ হাজার ১৬৩টি। মাত্র তিন মাসে আমানত হিসাব বেড়েছে প্রায় ১২.৬ শতাংশ। পুরুষ আমানত হিসাব: তিন লাখ ৬০ হাজার ৭৩৭ (জুনে ছিল তিন লাখ ২২ হাজার ৮৮৪) আর নারী আমানত হিসাব: এক লাখ ৮০হাজার ৮৮ (জুনে ছিল এক লাখ ৫৭ হাজার ২৭৯)। অর্থাৎ নারী আমানতকারীর অংশগ্রহণও ক্রমে বাড়ছে।
মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা , যা জুনে ছিল ৪৯ লাখ ৭৭৪ কোটি টাকা। তিন মাসে আমানত বেড়েছে প্রায় ৯৪৯ কোটি টাকা।
গৃহস্থালি খাতে আমানতকারীর বিস্তার : গৃহস্থালি খাতে ব্যক্তিগত আমানতকারীর সংখ্যা সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ছয় হাজার ৫৪ জন, যা জুনে ছিল ২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ : এক লাখ ৯৮ হাজার ৫০২ জন এবং নারী: এক লাখ সাত হাজার ৫৫২ জন।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠছে।
ঋণ হিসাব কমেছে, তবে টাকার অঙ্ক বেড়েছে : অন্যদিকে, ঋণ কার্যক্রমে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে মোট ঋণ হিসাবের সংখ্যা নেমে এসেছে এক লাখ ৯৫ হাজার ২০২টিতে, যা জুনে ছিল দুই লাখ চার হাজার ৯৬৫টি। পুরুষ ঋণ হিসাব: এক লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৩ আর নারী ঋণ হিসাব: ২৮ হাজার ৬২৯।
তবে ঋণের পরিমাণ কমেনি। বরং মোট ঋণ ও অগ্রিম দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৭৩৪.৫১ কোটি টাকা, যা জুনের তুলনায় প্রায় ৫৯৪ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ কম সংখ্যক ঋণগ্রহীতাকে তুলনামূলক বড় অঙ্কের ঋণ দেয়া হচ্ছে, যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কঠোরতার ইঙ্গিত দেয়।
গ্রাম-শহর বৈষম্য : শহরকেন্দ্রিক অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম : ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিক থেকে ২০২৫-এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়- শহরাঞ্চলে আমানত ও ঋণ কার্যক্রম গ্রামাঞ্চলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রান্তিকে শহরে আমানত হিসাব ৫ লাখের বেশি, যেখানে গ্রামে তা তুলনামূলকভাবে সীমিত আর ঋণ বিতরণেও শহরাঞ্চল প্রাধান্য বজায় রেখেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান -এর প্রবেশাধিকার ও আস্থা বাড়াতে আলাদা নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ : প্রবীণদের আমানত, মধ্যবয়সীদের ঋণ : গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বয়সভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী- ৬৫ বছর ঊর্ধ্বে আমানতকারীরা সংখ্যায় কম হলেও আমানতের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি (৭,০৪১.৩৯ কোটি টাকা), ৩৫-৫৪ বছর বয়সীরা ঋণগ্রহীতার বড় অংশ এবং ঋণের অঙ্কও সর্বোচ্চ আর ২৫-৩৪ বছর বয়সীরা নতুন ঋণগ্রহীতা হিসেবে দ্রুত বাড়ছে, যা উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতির ইঙ্গিত দেয়।
নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও ব্যবধান রয়ে গেছে : আমানত ও ঋণ- উভয় ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, তবে মোট অর্থের হিসাবে এখনও পুরুষদের আধিপত্য স্পষ্ট। বিশেষ করে ঋণ বিতরণে নারী ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ তুলনামূলক কম, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।
কেন আমানত বাড়ছে, কিন্তু ঋণগ্রহীতা কমছে?
বাংলাদেশের অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে সাম্প্রতিক প্রবণতাগুলো কেবল পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়; বরং এগুলো বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ঝুঁকি-মনস্তত্ত্ব এবং নীতিগত সঙ্কোচনের প্রতিফলন।
১. উচ্চ সুদ ও অনিশ্চয়তায় সঞ্চয়মুখী ঝোঁক : ২০২৪-২৫ অর্থবছরজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের অস্থিরতা ও বাজারে তারল্য সঙ্কটের কারণে সাধারণ মানুষ ব্যয় কমিয়ে সঞ্চয়ে ঝুঁকছে। অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাধারণত ব্যাংকের তুলনায় কিছুটা বেশি রিটার্ন দেয়ায় মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত শ্রেণী এই খাতে আমানত রাখাকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখছে।
বিশেষ করে ৬৫ ঊর্ধ্ব বয়সীদের আমানতের অঙ্ক সর্বোচ্চ হওয়া ইঙ্গিত দেয়, পেনশনভোগী ও অবসরকালীন সঞ্চয়কারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে স্থায়ী আয়ের উৎস খুঁজছেন।
২. ঋণ হিসাব কমে যাওয়ার নেপথ্যে রক্ষণশীল ঋণনীতি : যদিও মোট ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু ঋণ হিসাব ও ঋণগ্রহীতার সংখ্যা কমেছে। এর অর্থ হলো, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ কমিয়ে, তুলনামূলক বড় ও জামানত-সমর্থিত ঋণ প্রদান করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি জোরদার হওয়া, খেলাপি ঋণের চাপ এবং অতীতের কিছু অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সঙ্কট (লিকুইডিটি ও সুশাসন সঙ্কট) প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সতর্ক করে তুলেছে।
৩. শহরকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি : আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা : গ্রাম-শহর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে স্পষ্ট শহরাঞ্চলে আমানত ও ঋণ হিসাব ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, গ্রামাঞ্চলে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর।
এর অর্থ, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত এখনো মূলত শহরভিত্তিক মধ্যবিত্ত ও করপোরেট সংযোগসম্পন্ন গ্রাহকের ওপর নির্ভরশীল। গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ বা নারী-নির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা এখনও এই খাতের মূল ধারায় আসেনি।
৪. নারীর অংশগ্রহণ : ইতিবাচক ধারা, তবে কাঠামোগত বৈষম্য রয়ে গেছে : পরিসংখ্যান অনুযায়ী নারী আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বাড়লেও- মোট আমানত ও ঋণের অর্থমূল্যে নারীর অংশ কম এবং নারী ঋণগ্রহীতারা মূলত ছোট অঙ্কের ঋণে সীমাবদ্ধ।
এর পেছনে রয়েছে- সম্পদের মালিকানায় নারীর সীমাবদ্ধতা, জামানতভিত্তিক ঋণ কাঠামো এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক পণ্যের অভাব।
৫. বয়সভিত্তিক কাঠামো অর্থনীতির দিকনির্দেশনা দিচ্ছে : বয়সভিত্তিক তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরে, ২৫-৩৪ বছর বয়সীরা নতুন ঋণগ্রহীতা হিসেবে দ্রুত বাড়ছে স্টার্টআপ, এসএমই ও চাকরিভিত্তিক ঋণের চাহিদা, ৩৫-৫৪ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ঋণের বোঝা বহন করছে পরিবার ও ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং প্রবীণ শ্রেণী আমানতকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।
৬. নীতিগত বার্তা : অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত কোন দিকে যাচ্ছে : এই পরিসংখ্যানগুলো থেকে তিনটি বড় নীতিগত বার্তা পাওয়া যায়- অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, প্রবৃদ্ধির চেয়ে স্থিতিশীলতায় জোর দিচ্ছে, সঞ্চয় প্রবণতা বাড়ছে, যা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সতর্ক সঙ্কেত এবং গ্রাম ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা প্রণোদনা ছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে না।
বর্তমান চিত্র বলছে, বাংলাদেশের অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত একটি ট্রানজিশন পর্যায়ে রয়েছে- যেখানে অতীতের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ থেকে সরে এসে এখন টিকে থাকার কৌশলে মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই খাতকে টেকসই করতে হলে শুধু আমানত সংগ্রহ নয়, বরং উৎপাদনমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রামভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থার দিকে ফিরতে হবে। নইলে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প নয়, বরং তার ছায়া হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
ব্যাংক বনাম অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান : আচরণগত পার্থক্য কোথায়?
বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে সাধারণত ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান- এই দুই ভাগে দেখা হলেও বাস্তবে এদের গ্রাহক আচরণ, ঝুঁকি গ্রহণ, ঋণ কৌশল ও বাজার ভূমিকা এক নয়। সাম্প্রতিক অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান এই পার্থক্যকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।
১. আমানত আচরণ : নিরাপত্তা বনাম রিটার্ন : ব্যাংক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের প্রধান উদ্বেগ : নিরাপত্তা ও তারল্য, সরকারি ও বড় বেসরকারি ব্যাংকে আমানত রাখার প্রবণতা বেশি আর সুদের হার তুলনামূলক কম হলেও আস্থা বেশি।
অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীরা মূলত রিটার্ন-সংবেদনশীল, অবসরপ্রাপ্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অংশগ্রহণ বেশি এবং দীর্ঘমেয়াদি ডিপোজিটে আগ্রহ বেশি।
২০২৫ সালে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান-এ আমানত দ্রুত বাড়া দেখায়, যখন ব্যাংক খাতে সুদের হার ও সেবার মান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন মানুষ বিকল্প খাত খোঁজে।
২. ঋণ বিতরণ কৌশল : পরিমাণ বনাম বাছাই : ব্যাংক ঋণ বিতরণে পরিমাণ মুখ্য, করপোরেট ও বড় গ্রুপভিত্তিক ঋণে ঝোঁক এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের প্রভাব তুলনামূলক বেশি।
অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণ বিতরণে গ্রাহক বাছাই ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ; এসএমই, হাউজিং ও ভোক্তা ঋণে বিশেষায়িত খেলাপি হলে দ্রুত পুনরুদ্ধারমুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়।
অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান-এ ঋণ হিসাব কমে গিয়ে অঙ্ক বেড়েছে- এর অর্থ ব্যাংকের মতো ‘ভলিউম চেজ’ নয়, বরং ‘কোয়ালিটি লেন্ডিং’ কৌশল।
৩. গ্রাহক প্রোফাইল : গণমুখী বনাম নির্দিষ্ট শ্রেণিকেন্দ্রিক : ব্যাংক বৃহৎ জনগোষ্ঠী কাভার করে এবং সরকারি কর্মচারী, বড় ব্যবসায়ী, আমদানিকারক-রফতানিকারক প্রাধান্য পায়।
অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক গ্রাহক এবং শহুরে এসএমই, মধ্যবিত্ত গৃহস্থালি, রিয়েল এস্টেট ও ভোক্তা খাত থাকে।
বয়সভিত্তিক তথ্য বলছে, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান মূলত কর্মক্ষম মধ্যবয়সী ও অবসরপ্রাপ্ত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
৪. গ্রাম-শহর উপস্থিতি : বিস্তার বনাম কেন্দ্রীভবন : ব্যাংক এর গ্রাম ও শহর- উভয় জায়গায় বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রামীণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি রয়েছে।
অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং গ্রামীণ শাখা সীমিত, ঝুঁকি বেশি বলে আগ্রহ কম।
অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান-এর শহরনির্ভরতা প্রমাণ করে যে, এই খাত এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির বদলে নিরাপদ বাজারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
৫. নিয়ন্ত্রক সম্পর্ক : কঠোরতা বনাম নমনীয়তা : ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে কঠোর তদারকির আওতায় এবং মূলধন সংরক্ষণ ও তারল্য অনুপাত বাধ্যতামূলক।
অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক নমনীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তদারকি জোরদার করে। অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান-এর রক্ষণশীল আচরণ দেখায়- তদারকি শক্ত হলে এই খাতও ব্যাংকের মতো সতর্ক হয়ে ওঠে।
৬. সঙ্কটকালে আচরণ : রাষ্ট্রনির্ভরতা বনাম আত্মরক্ষা : ব্যাংক সঙ্কটে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রত্যাশা বেশি এবং পুনঃতফসিল ও নীতিগত ছাড় পায়। অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সঙ্কটে নিজস্ব তারল্য ব্যবস্থাপনায় নির্ভরশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ কমিয়ে দ্রুত সঙ্কোচন হয়।
বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন আত্মরক্ষামূলক কৌশল নিচ্ছে, যেখানে ব্যাংক খাত এখনও কাঠামোগত সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল।
ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান একই আর্থিক ব্যবস্থার অংশ হলেও তাদের আচরণগত পার্থক্য স্পষ্ট- ব্যাংক রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় পরিচালিত এবং অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাজার-ঝুঁকি ও টিকে থাকার যুক্তিতে পরিচালিত।
এই পার্থক্যই ব্যাখ্যা করে কেন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান দ্রুত সঙ্কুচিত বা রক্ষণশীল হয়, আর ব্যাংক খাত ধীরগতিতে হলেও কাঠামোগতভাবে টিকে থাকে।
এই তুলনামূলক চিত্র থেকে স্পষ্ট হয়- ব্যাংক খাত কাঠামোগতভাবে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ওপর দাঁড়িয়ে, আর অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত বাজার-ঝুঁকি, রিটার্ন ও টিকে থাকার বাস্তবতায় পরিচালিত।
বর্তমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় তাই অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান দ্রুত রক্ষণশীল হচ্ছে, অথচ ব্যাংক খাত তুলনামূলক ধীর গতিতে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে- এই পার্থক্যই আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরের দ্বৈত চরিত্রকে তুলে ধরে।



