দেশের পুঁজিবাজারের চলমান সঙ্কট উত্তরণে সরকারি প্রণোদনার চেয়েও বেশি প্রয়োজন বাজারে ভালো ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি ও তারল্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য প্রস্তাব করা কিছু প্রণোদনাকে স্বাগত জানিয়ে এই মন্তব্য করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রধান উপদেষ্টার সাথে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে যে পাঁচটি নির্দেশিকা প্রদান করা হয়েছে তার দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তিনি নয়া দিগন্তের সাথে ঘোষিত বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ে গৃহীত পদক্ষেপ বিশ্লেষণে একথা বলেন।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য যেসব প্রণোদনা রাখা হয়েছে তা বাজারকে গতিশীল করতে ভালো ভূমিকা রাখবে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ দীর্ঘদিন থেকে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীসহ এর অংশীজনরা বাজারের মন্দা কাটাতে বিভিন্ন প্রণোদনার প্রস্তাব করে আসছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল লিস্টেড ও নন-লিস্টেড কোম্পানির মধ্যে করহারের ব্যবধান বাড়ানো। আগে এ ব্যবধান ১০ শতাংশ থাকলেও গত সরকারের আমলে এটা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এবারের বাজেটে তা ২.৫০ শতাংশ বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ভালো কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহ পাবে।
মার্চেন্ট ব্যাংকের করহার ১০ শতাংশ হ্রাস করার প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি। মাচেন্টব্যাংকগুলো প্রকৃত অর্থে ব্যাংক না হলেও এগুলোতে তফসিলি ব্যাংকের মতোই সাড়ে ৩৭ শতাংশ কর দিতে হয়। এবারের করহ্রাসের প্রস্তাবে তাদের সে যৌক্তিক দাবি মেনে নেয়া হচ্ছে। এখন তাদের সাড়ে ২৭ শতাংশ কর দিতে হবে। এটা বাজারের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। তা ছাড়া ব্রোকারেজ হাউজের উৎসে কর ০ দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে ০ দশমিক ০৩ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাবকেও তিনি বাজারের জন্য ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
তবে আইসিবির চেয়ারম্যান মনে করেন, এ মুহূর্তে প্রণোদনার দরকার আছে এটা ঠিক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে টেকসই করতে দরকার বাজারে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ভালো কোম্পানির শেয়ার সরবরাহ বাড়াতে হবে যাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের গভীরতায় আকৃষ্ট হয়ে বিনিয়োগে উৎসাহ পান। এ প্রসঙ্গে তিনি সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাথে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে পুঁজিবাজারের সঙ্কট উত্তরণে যে পাঁচটি নির্দেশিকার কথা আলোচনা হয়েছিল তা দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এটা পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যা প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশিকায় উঠে আসে।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বিগত সরকারের আমলে অসংখ্য কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে যেগুলো এখন ভালো পারফর্ম করছে না এবং বাজারের জন্য বোঝা হয়ে আছে। এগুলোর বেশির ভাগই এখন ‘জেড’ গ্রুপে। এ কোম্পানিগুলো ঠিক সময় সাধারণ সভা করতে পারে না। পারে না সময়মতো লভ্যাংশ দিতে। ভালো কোনো ফান্ড ম্যানেজার যদি এ মুহূর্তে বাজপারে বিনিয়োগ করতে চায় তারা হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া বিনিয়োগের কোনো জায়গাই খুঁজে পাবে না। এ মুহূর্তে আমাদের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় তিনটি খাত ব্যাংক, বীমা ও মিউচুয়্যাল ফান্ড। তিনটির অবস্থাই খুব খারাপ। এগুলোতে বিনিয়োগকারী নেই বললেই চলে। এ ধরনের বাজারে দেশী বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগে উৎসাহ পাবে না। বিদেশীদেরতো প্রশ্নই আসে না। তিনি যেকোনো মূল্যে সরকারি উদ্যোগে বহুজাতিক কোম্পানিসহ দেশীয় লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুততম সময়ে বাজারে তালিকাভুক্তির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।
পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তিনি তারল্য প্রবাহের ওপরও জোর দেন। তিনি বলেন, এখন সরকারি বন্ড ও সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেড়েছে। তাহলে মানুষ কেন ঝুঁকি নিয়ে এখানে বিনিয়োগ করবে? অথচ তারল্য ছাড়া পুঁজিবাজার টিকবে না। তাই এখানে তারল্যপ্রবাহ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, আইসিবি ইতোমধ্যে সরকারের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার ফান্ড চেয়েছে যা দিয়ে প্রয়োজনীয় সময়ে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজারকে সাপোর্ট দেয়া যায়। এ ফান্ড পাওয়া গেলে তা বাজারের সঙ্কট কাটাতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারবে।
পুঁজিবাজারের চলমান সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার অনেকগুলো ব্যাংক চাইলেও লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন নিয়ে যে সমস্যা তা তারা হয়তো সহসা কাটিয়ে উঠতে পারবে। এক্ষেত্রে আগামী বছর তাদের এ সমস্যা থাকবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক নেয়া পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকগুলো খুব ধীরে হলেও সক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে আবার পুঁজিবাজারের সবচাইতে বড় এই খাতটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।



