যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

Printed Edition

আলজাজিরা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবন শুরুই হয়েছিল সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে। তিনি বারবার দাবি করেছেন যে, প্রগতিশীল আদর্শ এবং ‘ক্যান্সেল কালচার’ রক্ষণশীলদের কণ্ঠরোধ করছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প নিজেই এখন স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অভিবাসন আইন ব্যবহার করে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত বাকস্বাধীনতার অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করছেন।

সম্প্রতি ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ নিয়ে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তিনি হুমকি দিয়েছেন যে, যেসব সম্প্রচার মাধ্যম ‘জনস্বার্থ’ বিরোধী বা ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্য প্রচার করবে, তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে। ট্রাম্প এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘দেশপ্রেমহীন সংবাদ সংস্থার’ বিরুদ্ধে সঠিক তদন্ত বলে অভিহিত করেছেন।

নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর আগেও অনেক প্রেসিডেন্ট সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করেছেন। বুশ প্রশাসনের প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট বা বাইডেন প্রশাসনের ‘ডিসইনফরমেশন গভর্ন্যান্স বোর্ড’ নিয়ে বিতর্ক ছিল। তবে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের নির্বাহী পরিচালক ক্লেটন উইমার্স আল জাজিরাকে জানান, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে গণমাধ্যমকে ভয় দেখানো বা নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। উইমার্স বলেন, আইনিভাবে লাইসেন্স বাতিল করা দীর্ঘ প্রক্রিয়া হলেও এ ধরনের হুমকি মূলত সংবাদমাধ্যমকে ভয় দেখানোর জন্য দেয়া হয়। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার একটি রেডিও স্টেশনের কথা উল্লেখ করেন, যারা সরকারি হুমকির মুখে তাদের এক সংবাদ উপস্থাপকের পদাবনতি ঘটিয়েছে এবং রাজনৈতিক সংবাদ প্রচার কমিয়ে দিয়েছে।

স্বাধীন সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার

১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এফসিসি একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে পরিচিত ছিল; কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার নিজেকে সরাসরি ট্রাম্পের অনুসারী হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি এমনকি সিনেট কমিটির সামনে দাবি করেছেন যে, এফসিসি কোনো স্বাধীন সংস্থা নয়। এরপর সংস্থাটির ওয়েবসাইট থেকেও ‘স্বাধীন’ শব্দটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভিক্টর পিকার্ড একে এফসিসি-কে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের নজিরবিহীন ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন।

গণমাধ্যমের খোলনলচে বদলে দেয়া

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম কয়েক মাসেই এবিসি, সিবিএস এবং এনবিসির মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। এমনকি জনপ্রিয় টকশো সঞ্চালক জিমি কিমেল এবং স্টিফেন কোলবার্টের ওপরও চাপের সৃষ্টি করা হয়েছে। ট্রাম্প নিজেই সমাজমাধ্যমে দাবি করেছেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমকে ‘নতুন রূপ’ দিচ্ছেন। বড় বড় মিডিয়া হাউজগুলোর মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে ট্রাম্পের অনুসারী বা মিত্রদের সেখানে বসানো হচ্ছে, যাতে তারা সরকারের পছন্দের বয়ান প্রচার করে।

বহুমুখী আক্রমণ

বাক্স্বাধীনতার ওপর এ আঘাত শুধু সংবাদমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়। ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন আইন ব্যবহার করে ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। স্থায়ী বাসিন্দা বা ভিসাধারীদের বাক্স্বাধীনতার অধিকার নেই এমন যুক্তি দেখিয়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থী ও গবেষককে দেশ থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও ১৯৪৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে স্পষ্ট বলা আছে যে, অনাগরিকদেরও বাক্স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। এ ছাড়া সমাজমাধ্যমে যারা সরকারের সমালোচনা করছেন, তাদের শনাক্ত করতে টেক কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই গুগল, রেডিট এবং মেটার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে তলব করেছে এমন ব্যক্তিদের তথ্য দিতে যারা অভিবাসন কর্মকর্তাদের সমালোচনা করেছেন।