সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারে কড়া অবস্থানে বিজিবি কোস্টগার্ড

পাচারের সময় জব্দ ২২২৯৩ লিটার জ্বালানি

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

চড়া মূল্যে আমদানি করে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া জ্বালানি তেল সীমান্ত দিয়ে পাচারের চেষ্টা হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোতে। চরম সঙ্কটময় মুহূর্তেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় চড়া মূল্যে সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একাধিক সংস্থার গোয়েন্দা রিপোর্টে এমন তথ্য উঠে এসেছে। যার ওপর ভিত্তি করে ইতোমধ্যে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সদস্যরা। পৃথক অভিযানে জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল। আটক করা হয়েছে পাচার চক্রের একাধিক সদস্যকে।

জানা গেছে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য অনেক কম। এ দিকে বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতেও জ্বালানির জন্য পাম্পগুলোতে দেখা দিয়েছে উপচে পড়া ভিড়। তাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে জ্বালানি সঙ্কট। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে বাড়তি টাকা দিয়ে হলেও তারা অবৈধ পন্থায় জ্বালানি পেতে চেষ্টা করছে। আর এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে বাংলাদেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।

তথ্যমতে, সরকারি রেট অনুযায়ী বাংলাদেশে এক লিটার পেট্রল খুচরা হিসাবে বিক্রি হচ্ছে ১১৬ টাকায়। সেখানে ভারতের কলকাতায় এক লিটার পেট্রল বিক্রি করা হচ্ছে ১০৫.৪৫ রুপিতে, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৩৯ টাকা হয়। তবে অবৈধ পন্থায় পাচার বা কালোবাজারিতে সরকারি রেট ধরে বিক্রি হয় না। সেখানে মুনাফালোভীরা চড়া দাম ধরে করে থাকে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে গত ৩১ মার্চ সারা দেশে বিভিন্ন জেলায় অভিযানে ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার অবৈধভাবে মজুদকৃত জ্বালানি তেল উদ্ধার করেছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া গতকাল ১ এপ্রিল শুধু নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৮০ লিটার জ্বালানি তেল।

সূত্রমতে, ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল মজুদ ও পাচার প্রতিরোধে হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম সীমান্তে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিজিবি তিস্তা ব্যাটালিয়ন (৬১ বিজিবি)। জ্বালানি পাচার রোধে সীমান্ত এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সীমান্তসংলগ্ন ফিলিং স্টেশন ও ডিলারদের জ্বালানি তেল উত্তোলন ও বিক্রয় কার্যক্রমও নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন যানবাহনে আকস্মিক তল্লাশি, নিয়মিত মোবাইল টহল জোরদার এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন রুটে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। তেল পাচারের সাথে জড়িত সম্ভাব্য সিন্ডিকেট শনাক্তকরণে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদারে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কাজ করে যাচ্ছে। একই সাথে অবৈধ জ্বালানি মজুদ ও পাচারের কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক সভা আয়োজন করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণকে তেল পাচার থেকে বিরত থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: শরিফুল ইসলাম নয়া দিগন্ত বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সঙ্কট ও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অননুমোদিতভাবে জ্বালানি তেল মজুদের অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে। জ্বালানি তেল মজুদের অপচেষ্টা প্রতিরোধ, জ্বালানি তেল বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ডিপোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিজিবি সদর দফতরের তত্ত্বাবধানে মোতায়েন কার্যক্রম একটি সুপরিকল্পিত কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। ইউনিট সদর থেকে দূরবর্তী স্থানে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে নিরাপদ স্থানে অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছে।

গত ২৫ মার্চ ২০২৬ তারিখ সকাল থেকে ঢাকা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সুনামগঞ্জের মোট ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়ন করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার প্রতিরোধে সীমান্তে অতিরিক্ত টহল পরিচালনা, নৌ টহল জোরদার, চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী আইসিপি ও এলসিপিগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানি-রফতানিতে ব্যবহৃত ট্রাক-লরিসহ বিভিন্ন যানবাহনে নিয়মিতভাবে তল্লাশি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার বিএন সাব্বির আলম সুজন নয়া দিগন্তকে বলেন, মিয়ানমারে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চোরাচালান রোধে উপকূলীয় ও সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ২৪/৭ টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় জ্বালানি সঙ্কটকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারে বাংলাদেশ থেকে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী পাচারের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তবর্তী উপকূলীয় এলাকা ও নদীপথে চোরাচালান প্রতিরোধে ইতোমধ্যে টহল কার্যক্রম এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে গত এক মাসে পাচারকালে ২২ হাজার ২৯৩ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা করেছে। এ ঘটনায় জড়িত ৩২ জন পাচারকারীকে আটক করে জব্দকৃত জ্বালানি তেল এবং আটককৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে যেকোনো ধরনের চোরাচালানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের অভিযান অব্যাহত থাকবে জানান সাব্বির আলম সুজন।