জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে বদলেছে ক্ষমতার কেন্দ্র। একই সাথে বদলেছে শাসনের ভাষা ও প্রতিশ্রুতি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থ বণ্টনের মূল স্রোতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসেনি। ই-জিপি, সিপিটিইউ ও কোম্পানি রেজিস্ট্রির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কিছু নতুন নাম যুক্ত হলেও অধিকাংশ বড় কাজ এখনো ঘুরে ফিরে যাচ্ছে পুরনো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বলয়ের হাতেই। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে তাই বদলাচ্ছে না সুবিধাভোগী শ্রেণীর কাঠামো শুধু বদলাচ্ছে তাদের পরিচয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল মানেই শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ক্রয় এবং নীতিনির্ধারণ সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালে সুবিধাভোগীদের তালিকায় পরিবর্তন আসার কথা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময়ই বলে ভিন্ন কথা। জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে তা হচ্ছে ক্ষমতা বদলেছে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার আশপাশে থাকা ব্যবসায়ী শ্রেণী আদৌ বদলায়নি।
সিপিটিইউ-এর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে ই-জিপি প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৩২ হাজার সরকারি টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। এসব টেন্ডারের মধ্যে ১০ কোটি টাকার বেশি মূল্যমানের বড় প্রকল্প ছিল প্রায় ৪২০টি। সবচেয়ে বড় ৫০টি টেন্ডারের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
তথ্যে দেখা যায়, এই শীর্ষ ৫০টি টেন্ডারের বিজয়ী তালিকর মধ্যে ৩৪টি প্রকল্প অর্থাৎ প্রায় ৬৮ শতাংশ পেয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান, যারা আগের সরকার আমলেও নিয়মিত বড় কাজ করত। বাকি ১৬টি বা ৩২ শতাংশ প্রকল্প গেছে তুলনামূলক নতুন কিংবা আগে বড় পরিসরে কাজ না পাওয়া প্রতিষ্ঠানের হাতে। অর্থাৎ সংখ্যার হিসাবে নতুনদের প্রবেশ দেখা গেলেও অর্থের অঙ্কের দিক থেকে পুরনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর আধিপত্য এখনো স্পষ্ট।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় টেন্ডারের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে সড়ক ও জনপথ খাতে, যা মোট প্রকল্পের প্রায় ৩৯ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গেছে ২৬ শতাংশ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রকল্প ১৮ শতাংশ, পানি ও স্যানিটেশন খাতে ৯ শতাংশ এবং আইটি, সরবরাহ ও কনসালটেন্সি মিলিয়ে বাকি ৮ শতাংশ। সড়ক ও বিদ্যুৎ খাতে দেয়া টেন্ডারের প্রায় ৭৫ শতাংশই পেয়েছে পুরনো বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
সরকার বদলালেও সুবিধাভোগী বদলেছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কোম্পানি রেজিস্ট্রির তথ্য বিশ্লেষণ করলে আরো একটি চিত্র স্পষ্ট হয়। জুলাইয়ের পর বড় টেন্ডার পাওয়া ৫০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২টির পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডারদের নাম পাওয়া গেছে আগের সরকার আমলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারের সাথে যুক্ত হিসেবে। আবার ১৪টি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন হয়েছে গত তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে; কিন্তু তাদের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক যোগাযোগসম্পন্ন ব্যক্তিরা। প্রকৃত অর্থে সম্পূর্ণ নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা যায় মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে।
তথ্যে বিশ্লেষণে পুরনো ঠিকাদারদের পুনরুত্থানের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সিপিটিইউ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শীর্ষ ২০ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তুলনামূলকভাবে কম কাজ পেয়েছিল। তবে জুলাইয়ের পর এই আটটির মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান আবার বড় অঙ্কের টেন্ডার জিতেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান নতুন নামে সহযোগী বা অংশীদারি কোম্পানি খুলে দরপত্রে অংশ নিয়েছে, যা কাগজে-কলমে নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরা পড়লেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পুরনো নেটওয়ার্ক।
একজন সাবেক সিপিটিইউ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর ই-জিপি ব্যবস্থার কারণে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বেড়েছে ঠিকই; কিন্তু প্রকৃত প্রতিযোগিতা এখনো সীমিত। তার ভাষায়, ‘অভিজ্ঞতা, অর্থ ও নেটওয়ার্ক এই তিনটির সমন্বয় যাদের আছে, তারাই বারবার ঘুরে ফিরে বড় কাজ পাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাইয়ের পর বড় কাজ পাওয়া নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ শতাংশই আগে সাব-কন্ট্রাক্টর বা মাঝারি ঠিকাদার হিসেবে কাজ করত। অর্থাৎ তারা হঠাৎ করে নয়, ধাপে ধাপে বড় ঠিকাদারি শ্রেণীতে প্রবেশ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে তুলনামূলক বেশি প্রাথমিক মূলধন, সহজে ব্যাংক গ্যারান্টি সংগ্রহের সক্ষমতা এবং পরিচালকদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিচিতি।
সিপিটিইউ-এর তথ্যে দেখা যায়, বড় টেন্ডারে গড় দরদাতার সংখ্যা মাত্র ৩.১। অনেক প্রকল্পে দুই থেকে তিনটির বেশি দরপত্র জমা পড়ে না। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কার্যকর প্রতিযোগিতার জন্য যেখানে পাঁচ থেকে সাতটি দরদাতার অংশগ্রহণ প্রয়োজন, সেখানে এই সীমিত অংশগ্রহণ প্রকল্প ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সরকারি টেন্ডার ঘিরে গড়ে ওঠা এই নতুন ও পুরনো ব্যবসায়ী শ্রেণীর প্রভাব অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও পড়ছে। ব্যাংক খাতের তথ্য অনুযায়ী, বড় করপোরেট ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের হার প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। এর ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণপ্রাপ্তিতে পিছিয়ে পড়ছেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি অর্থনৈতিক সংস্কারেরও সুযোগ। কিন্তু যদি রাষ্ট্রীয় ক্রয়ব্যবস্থা, প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ এবং প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির মতো কাঠামোগত সংস্কার না হয়, তাহলে সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী শ্রেণীর চরিত্র বদলাবে না। বদলাবে শুধু তাদের পরিচয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পুরনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একটি অংশ সাময়িকভাবে পিছিয়ে গেলেও তারা পুরোপুরি মাঠ ছাড়ে না। কেউ নতুন নামে, কেউ অংশীদার বদলে, কেউ আবার আত্মীয়স্বজনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে দৃশ্যত পরিবর্তন দেখা গেলেও ভেতরের কাঠামো অনেকাংশেই অপরিবর্তিত থেকে যায়।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে কিছু নতুন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উত্থান স্পষ্ট। এদের অনেকেই আগে বড় প্রকল্পের সাথে যুক্ত ছিল না, আবার কেউ কেউ মাঝারি পর্যায়ের কাজ করত। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা দ্রুত নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে আইটি, সেবা খাত, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে নতুন ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ বেড়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণীর উত্থান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের সাথে যুক্ত। অর্থাৎ রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে সংযোগ ছাড়া বড় পরিসরে রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়া এখনো কঠিন।
সরকার পরিবর্তনের পর জনমনে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনে স্বচ্ছতা বাড়বে, একচেটিয়া সুবিধাভোগীতা কমবে। কিন্তু বাস্তবে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো যদি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে সুবিধাভোগীদের তালিকায় মৌলিক পরিবর্তন আসা কঠিন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব কেবল টেন্ডার জয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা ব্যাংকিং খাতে বিশেষ সুবিধা, পুনঃতফসিলকৃত ঋণ, কর ছাড় এবং নীতিগত সহায়তাও পেয়ে থাকে। ফলে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয় তৈরি হয়, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে সমান্তরালভাবে টিকে থাকে।
একজন অর্থনীতি গবেষক বলেন, ক্ষমতা বদলালেও যদি একই ধরনের নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক চর্চা চলতে থাকে, তাহলে কেবল ব্যবসায়ীদের নাম বদলাবে, শ্রেণী বদলাবে না। জুলাইয়ের পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো পুরনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পুনরুত্থান। যারা একসময় ক্ষমতার খুব কাছাকাছি ছিল, তারা নতুন পরিস্থিতিতে কিছুটা নীরব থাকলেও ধীরে ধীরে আবার দৃশ্যপটে ফিরে আসছে। কেউ কেউ নতুন রাজনৈতিক শক্তির সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলছে, কেউ আবার ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব বদলে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করছে।
ক্ষমতার নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণীর উত্থান কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। যখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় প্রভাবিত হয়, তখন নীতিনির্ধারণের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন কিছু মুখ এনেছে, কিন্তু ব্যবসায়ী শ্রেণীর কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো সীমিত। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ক্রয়ব্যবস্থার গভীর সংস্কার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং প্রকৃত মালিকানা ও স্বার্থের স্বচ্ছ প্রকাশ। তারা বলছেন, ক্ষমতার পালাবদল যতবারই হোক, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার কেন্দ্র ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসায়ী শ্রেণী বদলাবে না শুধু তাদের পরিচয় বদলাবে। ক্ষমতার নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণী তখন আর নতুন থাকবে না, হয়ে উঠবে পুরনো ব্যবস্থারই আরেকটি সংস্করণ।



