নিজস্ব প্রতিবেদক
একটি মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের বাবার কাছে মেয়ের বিয়ে মানেই জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্ন ও দায়িত্ব। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে এসে যখন বাবার নিথর দেহ মুখবাঁধা অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকে, তখন সেই নির্মমতার গভীরতা পরিমাপ করা কঠিন। এমনই এক হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে জামালপুরের মো: ইসমাইল হোসেনের (৫০) জীবনে। মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করতে এবং বিয়ের কেনাকাটার জন্য জমি বিক্রির টাকা নিয়ে ঢাকা এসে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরলেন এই হতভাগ্য পিতা।
নিহত ইসমাইল হোসেনের ছোট মেয়ে শারমিন। তার বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত করতেই ইসমাইল হোসেন জামালপুর থেকে ঢাকায় আসছিলেন। মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাতে সম্প্রতি নিজের ১১ শতাংশ জমি সাড়ে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন তিনি। জমি বিক্রির সেই টাকা থেকে দুই লাখ টাকার ঋণ শোধ করেন এবং গ্রামে একটি ঘর তৈরি করতে কিছু টাকা খরচ করেন। আর অবশিষ্ট নগদ পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে তিনি রওনা হয়েছিলেন ঢাকার উদ্দেশে। সাথে ছিল একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও একটি বাটন ফোন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই টাকা কিংবা ফোন-আজ কোনো কিছুরই সন্ধান মেলেনি, মিলেছে কেবল বাবার নিথর দেহ।
গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে জামালপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন ইসমাইল হোসেন। রওনা হওয়ার আগে ছেলে হাসানকে ফোনে তিনি জানিয়েছিলেন যে সকালেই ঢাকায় পৌঁছাবেন। শুক্রবার সকালে গাজীপুরের জিরানীতে তার পৌঁছানোর কথা ছিল এবং ছেলে হাসান জিরানীতে গিয়ে বাবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও বাবার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পান হাসান।
এ দিকে শুক্রবার সকাল পৌনে ৯টায় রাজধানীর বনানী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের গায়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের ইউনিফর্মের মতো একটি নীল রঙের শার্ট ও লুঙ্গি ছিল। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় আঙুলের ছাপ জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সাথে মিলিয়ে পুলিশ তার পরিচয় নিশ্চিত করে জামালপুরের বাড়িতে খবর পাঠায়।
মেয়ের বিয়ের দায় মেটাতে এসে সব হারিয়ে আজ ইসমাইলের পরিবার শোকে পাথর। নিহতের ছেলে হাসান জানান, তার বাবা ৯ মাস আগে ডেল্টা স্পিনিং মিলে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করতেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এরপর কিছু দিন স্ত্রী, দুই সন্তান ও ছেলের বউকে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে থাকার পর চার মাস আগে তিনি জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান, যেখানে তার বৃদ্ধা মা ও বড় বোন থাকেন। মেয়ের বিয়ের জন্য বিক্রি করা জমির পাঁচ লাখ টাকা, মোবাইল দু’টি এবং বাজারের ব্যাগ-যার কিছুই লাশের সাথে পাওয়া যায়নি।
বনানী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম তালুকদার জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ইসমাইল হোসেনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর কোনো একটি গাড়ি থেকে তার লাশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে দেয়া হয়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পুলিশ এক্সপ্রেসওয়ের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকটি সন্দেহভাজন গাড়ি শনাক্ত করেছে। এটি কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি মলম পার্টি বা অজ্ঞান পার্টির কাজ, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। খোয়া যাওয়া টাকা ও মোবাইল উদ্ধারেও পুলিশ কাজ করছে এবং লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
রাজধানীতে আরো ২ অপমৃত্যু
শুক্রবার রাতে কারওয়ান বাজার এলাকায় রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় আনুমানিক ৫৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তার পরনে ছিল নীল রঙের শার্ট ও সাদা পায়জামা। স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবসায়ী আবদুল কাদেরের সহায়তায় গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
অন্য দিকে, রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে পারিবারিক কলহের জেরে মিথিলা আক্তার নীলা (১৮) নামে এক তরুণী সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে থাকা সাবেক স্বামীর সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলা নিয়ে বর্তমান স্বামী শাকিলের সাথে কথা-কাটাকাটি হয় মিথিলার। এরই জেরে স্বামীর ওপর অভিমান করে শনিবার ভোররাত আড়াইটার দিকে নিজ ঘরে ফাঁস দেন তিনি।



