গোলাম মঞ্জুরে মাওলা অপু লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) সংবাদদাতা
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামলে পদ্মা সেতুতে টোল আদায় ও যানবাহন পারাপারে নতুন রেকর্ড গড়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। ঈদের ছুটির তিন দিনে সেতু দিয়ে এক লাখ ১৯ হাজার ৬৮২টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এ সময় টোল আদায় হয়েছে ১৩ কোটি ২১ লাখ ৫১ হাজার ৮০০ টাকা, যা এ সময়ে সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৩ জেলার মানুষের যাতায়াতে নতুন গতি এসেছে। প্রতি বছর ঈদ এলেই রাজধানী ছেড়ে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে এ সেতুতে। চলতি ঈদেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে বাড়তি চাপ সত্ত্বেও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি ছাড়াই নির্বিঘেœ সেতু পারাপার সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ঈদের ছুটির দ্বিতীয় দিন ১৮ মার্চ ২৪ ঘণ্টায় মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত দিয়ে মোট ৪১ হাজার ৮৮৫টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। এ দিন টোল আদায় হয় চার কোটি ৫৪ লাখ পাঁচ হাজার ২৫০ টাকা, যা একদিনে টোল আদায়ের পঞ্চম সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর পরের দিন ১৯ মার্চ ৩৯ হাজার ২৮০টি যানবাহন পারাপার হয় এবং টোল আদায় হয় চার কোটি ৪৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ টাকা। ১৭ মার্চ পারাপার হয় ৩৮ হাজার ৫১৭টি যানবাহন, এতে টোল আদায় হয় চার কোটি ১৮ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ টাকা।
তিন দিনের এ হিসাব অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় চলতি ঈদে যানবাহন ও টোল আয়- দু’টিই বেড়েছে। গত বছর একই সময়ে (২৮-৩০ মার্চ) তিন দিনে এক লাখ ৮০০২টি যানবাহন পারাপার হয়েছিল এবং টোল আদায় হয়েছিল ১২ কোটি ৭৮ হাজার ৪০০ টাকা। সে হিসাবে এবার প্রায় ১৮ হাজার ৮৮০টি বেশি যানবাহন পারাপার হয়েছে এবং টোল আয় বেড়েছে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ টাকা।
সেতু কর্তৃপক্ষের টোল রিপোর্ট অনুযায়ী, পদ্মা সেতু চালুর পর এক দিনে সর্বোচ্চ টোল আদায়ের রেকর্ড হয়েছিল ২০২৫ সালের ৫ জুন। ওই দিন ৫২ হাজার ৪৮৭টি যানবাহন পারাপারে টোল আদায় হয়েছিল পাঁচ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল, ১৪ জুন এবং ২০২৩ সালের ২৭ জুনও উচ্চ টোল আদায়ের নজির রয়েছে। চলতি ঈদের দ্বিতীয় দিনের আয় সেই তালিকায় পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে।
সেতু বিভাগ জানায়, ঈদ উপলক্ষে বাড়তি যানবাহনের চাপ সামাল দিতে মাওয়া প্রান্তে ১০টি এবং জাজিরা প্রান্তে ৯টিসহ মোট ১৯টি টোলবুথ সার্বক্ষণিক চালু রাখা হয়। ফলে কোনো প্রকার দীর্ঘ যানজট ছাড়াই দ্রুত সময়ের মধ্যে যানবাহন পারাপার সম্ভব হয়েছে। টোল আদায়ে ক্যাশ, ক্রেডিট ও ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) পদ্ধতি ব্যবহার করায় কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়েছে।
সেতু কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মাসুদ রানা শিকদার বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘœ রাখতে আগে থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহযোগিতায় টোল ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খল রাখা সম্ভব হয়েছে। এর ফলেই বাড়তি চাপেও কোথাও যানজট তৈরি হয়নি।
পদ্মা সেতুর সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় বলেন, নিবিড় তদারকি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কারণে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সামলাতে কোনো বেগ পেতে হয়নি। ঘরমুখো মানুষ স্বস্তিতেই সেতু পার হয়েছেন। টোল প্লাজায় কোথাও দীর্ঘ সারি বা ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়নি।
এ দিকে গত শুক্রবার (২০ মার্চ) দুপুরে মাওয়া টোল প্লাজা পরিদর্শন করেন নৌপরিবহন ও সড়ক পরিবহন-সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো: রাজিব আহসান। তিনি টোল ব্যবস্থাপনা ও ঈদযাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং যাত্রীদের নির্বিঘœ যাতায়াতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে, তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে এ ধরনের পরিসংখ্যানে। একই সাথে দেশের সড়ক অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও সক্ষমতারও প্রমাণ দিচ্ছে এ সেতু।
সেতু কর্তৃপক্ষের মতে, সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর টোল সংগ্রহ পদ্ধতির কারণে চলতি ঈদে পদ্মা সেতু দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন চলাচল ছিল নির্বিঘœ ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। ফলে রেকর্ডসংখ্যক যানবাহন পারাপার ও টোল আদায়ের এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।



