চট্টগ্রামে ৯৯ শতাংশ ভবনেই নিয়মভঙ্গের অভিযোগ

Printed Edition

আরফাত বিপ্লব চট্টগ্রাম ব্যুরো

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শহর যেন দুই রূপে দাঁড়িয়ে আছে। একটি কাগজে; সেখানে ভবনের সামনে খোলা জায়গা আছে, পাশে পর্যাপ্ত ফাঁকা স্থান, নিচতলায় গাড়ি রাখার ব্যবস্থা, ড্রেন-খাল উন্মুক্ত, জলাধার সংরক্ষিত। আরেকটি বাস্তবে; যেখানে দু’টি ভবন গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান, খালের ওপর স্থাপনা, পুকুর ভরাট করে বহুতল ভবন, পাহাড় কেটে আবাসিক প্রকল্প। এই দুই চিত্রের মধ্যে ব্যবধানের সরকারি স্বীকৃতিই যেন মিলেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সাম্প্রতিক মূল্যায়নে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুমোদন দেয়া ২৯ হাজার ৭০০টি ভবনের প্রায় ৯৯ শতাংশই অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। সংখ্যাটি শুধু বিস্ময়কর নয়, নগর পরিকল্পনা, প্রশাসনিক তদারকি এবং আইনের প্রয়োগ নিয়ে বড় প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। কারণ, একটি ভবন একদিনে তৈরি হয় না। নির্মাণের বিভিন্ন ধাপে সিডিএর পরিদর্শনের সুযোগ থাকে। তাহলে হাজার হাজার ভবন কিভাবে নিয়ম ভেঙে দাঁড়িয়ে গেল? এ প্রশ্ন এখন নগরজুড়ে।

অনুমোদিত নকশা বনাম বাস্তবতা

সিডিএর অনুমোদিত নকশায় প্রতিটি ভবনের উচ্চতা, সেটব্যাক, পার্কিং, খোলা জায়গা, অগ্নিনিরাপত্তা, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন এবং ভবনের অবস্থান নির্ধারণ করা থাকে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কোথাও ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ হয়েছে ১০ বা ১২ তলা। কোথাও সামনের পাঁচ ফুট খালি জায়গা পুরোপুরি দখল করা হয়েছে। কোথাও পাশের বাধ্যতামূলক ফাঁকা স্থান নেই। অনেক ভবনের নিচতলার পার্কিং এখন মার্কেট বা শোরুম। এসব অনিয়ম নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে দৃশ্যমান। তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। ১৫ বছরে কী করেছে তদারকি বিভাগ? নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ভবনের নকশা অনুমোদনের পর সিডিএর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আইন অনুযায়ী নির্মাণকাজ চলাকালে বিভিন্ন ধাপে পরিদর্শন, অনিয়ম শনাক্ত এবং প্রয়োজনে নির্মাণ বন্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে সংস্থাটির। নগরবিদদের মতে, ২৯ হাজার ভবনের অনিয়ম একদিনে হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল।

অভিযোগ রয়েছে- নকশা অনুমোদনের পর বাস্তব নির্মাণে কার্যকর নজরদারি দুর্বল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর গিয়ে নোটিশ দেয়া হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠলেও তা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে ভবন পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। এরপর উচ্ছেদ বা সংশোধন কার্যত কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের প্রয়োগ যদি নির্মাণের শুরুতেই নিশ্চিত করা যেত, তাহলে আজ হাজার হাজার নকশাবহির্ভূত ভবন দাঁড়ানোর সুযোগ পেত না।

পুকুর, খাল ও জলাধার নিয়ে পুরনো বিতর্ক

চট্টগ্রামের নগরায়ণের সাথে সাথে অসংখ্য পুকুর, জলাধার ও খাল হারিয়ে গেছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, বহু জলাধার ভরাট করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ হয়েছে। অতীতে ভূমির প্রকৃতি নির্ধারণ, সাইট পরিদর্শন এবং অনুমোদন প্রতিবেদনে সব ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার দাবি উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোথাও জলাধারকে সমতল ভূমি হিসেবে দেখিয়ে অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে, তবে সেই নথি, জরিপ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা পুনঃপর্যালোচনা জরুরি।

পার্কিং দখলেই বাড়ছে যানজট

চট্টগ্রামের বহু ভবনে অনুমোদিত পার্কিং এলাকা এখন দোকান, ব্যাংক, গুদাম বা অফিস। ফলে গাড়ি রাখার জায়গা না পেয়ে সড়কেই পার্কিং করতে হয়। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ বলছে, অনেক সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ ভবনের ভেতরে পার্কিং সুবিধা না থাকা। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পার্কিং দখলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নতুন ফ্লাইওভার বা সড়ক নির্মাণ করেও যানজট পুরোপুরি কমানো যাবে না।

জলাবদ্ধতার পেছনেও কি নকশাবহির্ভূত নির্মাণ?

প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রামের বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অতিবৃষ্টি নয়, এর পেছনে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণও বড় কারণ। ভবনের চারপাশে খোলা জায়গা না রাখা, ড্রেন সঙ্কুুচিত করা, খাল দখল, জলাধার ভরাট- এসব কারণে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ নষ্ট হয়েছে।

তা ছাড়া, অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের সময় ভবনের চারপাশে খোলা জায়গা না থাকলে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় বলেছেন, নগরের অনেক এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি প্রবেশ করানোই সম্ভব হয় না। অনেক ভবনে জরুরি নির্গমন পথও ব্যবহারযোগ্য নেই। ফলে শুধু আইন ভঙ্গ নয়, জননিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অনুমোদিত নকশা অমান্য করলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেয়া হবে না। কয়েকটি ভবন ও হাসপাতালকে ইতোমধ্যে অবৈধ অংশ অপসারণে নোটিশও দেয়া হয়েছে। তবে নগরবাসীর প্রশ্ন, যে ২৯ হাজার ভবন ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে?