বেড়ায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ‘ভুয়া’ শিক্ষার্থীর তালিকা

১১২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশে প্রকৃত উপস্থিতির তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী দেখিয়ে অতিরিক্ত খাদ্য বরাদ্দ নেয়া হচ্ছে

Printed Edition

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)

পাবনার বেড়া উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ১১২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশে প্রকৃত উপস্থিতির তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী দেখিয়ে অতিরিক্ত খাদ্য বরাদ্দ নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দের ডিম, ব্রেড, দুধ, কলা ও বিস্কুটের অপব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন তদন্তে উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহায়তায় ২০২৫ সালে শুরু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচি ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। কর্মসূচির আওতায় দেশের ৬২ জেলার ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে পাঁচ দিন ডিম, ব্রেড, দুধ, বিস্কুট ও কলা সরবরাহ করা হচ্ছে।

বেড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাবনা জেলার মধ্যে শুধু বেড়া উপজেলাই এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে। উপজেলার ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ২৪ হাজার ৬৫৮ জন। এর মধ্যে গড়ে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য নিয়মিত খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থীর প্রকৃত উপস্থিতি, হাজিরা খাতা ও খাদ্য বরাদ্দের মধ্যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে অসঙ্গতি রয়েছে। ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১৯০ জন হলেও হাজিরা খাতায় উপস্থিত ছিল ১১১ জন। তবে প্রতিদিন ১৭১ জনের নামে খাদ্য বরাদ্দ আসে। বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ ডিম খেতে দেখা যায়। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সেখান থেকে সরে যান।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসরাইল হোসেন বলেন, ‘ডিম, কলা ও ব্রেডের মতো পচনশীল খাদ্য অনেক সময় শিক্ষার্থীদের দিয়ে দেয়া হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকরা গ্রহণ করেন। তবে দুধ ও বিস্কুট সংরক্ষণ করে রাখা হয়।’ তিনি অতিরিক্ত খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেন।

শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রূপগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০৪ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৯১ জনের জন্য খাদ্য বরাদ্দ থাকলেও নিয়মিত উপস্থিতি ৫০ থেকে ৬০ জন। কোমরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি রেজিস্টারে ৩১৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেও নিয়মিত উপস্থিত হয় ২০০ থেকে ২২০ জন; অথচ ২৭৫ জনের জন্য খাদ্য বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। তালিমনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিন মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী পাওয়া যায়, যদিও বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী ৫৭ জন। আকনাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও হাজিরা খাতার তথ্যের সাথে বাস্তব উপস্থিতির পার্থক্য দেখা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ, ভাটি ও চরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে প্রকৃত উপস্থিতির তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী দেখিয়ে অতিরিক্ত খাদ্য বরাদ্দ নেয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত খাদ্য শিক্ষকরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বেড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ফারুক হোসেন বলেন, কিছু বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও অসঙ্গতি রয়েছে। সেগুলো নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী উদ্বৃত্ত খাদ্য অন্যান্য শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার পর উপবৃত্তি ও বই নেয়ার পর অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যায় অথবা পরিবারসহ অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। ফলে ভর্তি রেজিস্টার ও বাস্তব উপস্থিতির মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুনাল্ট চাকমা বলেন, স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।