পতিত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রায় দুই বছর পর হঠাৎ কেন এই ঘোষণা- তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
যদিও এই ঘোষণাটি তার দল কিংবা মুখপাত্রের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আসেনি, খোদ শেখ হাসিনাই এক গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ক্লিপে এই বার্তা দিয়েছেন। তার এই বক্তব্য কি কেবলই আত্মগোপনে থাকা ও মনোবল হারানো তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার একটি ‘রাজনৈতিক কৌশল’, নাকি এর পেছনে ভারত ও তার মিত্র শক্তিগুলোর কোনো নতুন পুনর্বাসনপ্রক্রিয়ার ইঙ্গিত রয়েছে- তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিভিন্ন মতামত দিচ্ছেন।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে মূলত তিনটি প্রধান আলোচনা চাউর হয়েছে: ১. কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরত আসা, ২. ভারত ও অন্যান্য বৃহৎ শক্তির ভূ-রাজনৈতিক চাপে সরকারের সাথে সমঝোতা, নাকি ৩. এটি শুধুই একটি রাজনৈতিক কৌশল, যা বাস্তবে কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।
মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত করে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। গণহত্যার নির্দেশ, উসকানি এবং তা রোধে ব্যর্থতার দায়ে তাকে এই সাজা দেয়া হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমানের আমলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রেক্ষাপটের সাথে বর্তমান পরিস্থিতির আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে মাথার ওপর মৃত্যুদণ্ডের সাজা ও তীব্র জনরোষ নিয়ে তিনি জীবনের ঝুঁকি নেবেন কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে।
২০২৪-এর পতনের পর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিদেশে পাড়ি জমায় এবং দেশের ভেতরের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কিছু নেতাকর্মী কিছুটা প্রকাশ্যে আসা বা ক্ষমতাসীনদের সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করলেও দলের সার্বিক ভিত্তি এখনো নড়বড়ে।
আইনি প্রক্রিয়া ও বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আইনি জটিলতা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনবিদ ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান জানান : ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরলেও বিমানবন্দরেই তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং আইন অনুযায়ী তার সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আর যদি তিনি না ফেরেন, তবে রাষ্ট্র তাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে পারে। এর জন্য ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত (এবং ২০১৬ সালে সংশোধিত) ভারত-বাংলাদেশ ‘বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি’ অনুযায়ী কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। তবে এটি ভারতের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ওপরও অনেকাংশেই নির্ভর করে।’
তিনি আরো জানান, অন্তর্বর্তী সরকার বিচার চলাকালেই তাকে ফেরানোর চিঠি পাঠিয়েছিল, কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে তখন সাড়া মেলেনি। বর্তমান সরকার চাইলে সেই কূটনৈতিক চিঠি ও প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
শেখ হাসিনার ঘোষণার পর সরকারের পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করে বলেছেন : ‘আমরা তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই দেশে ফেরত চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এবং বিদ্যমান বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে তিনি দেশে এসে বিচারের মুখোমুখি হন।’
তিনি আরো জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে ব্যক্তি শেখ হাসিনার পাশাপাশি সংগঠন হিসেবেও আওয়ামী লীগকে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ নেয়ার চেয়ে ‘কৌশলগত’ হিসেবেই বেশি দেখছেন।
রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, শেখ হাসিনার পক্ষে আর কখনো দেশে ফেরা সম্ভব নয়। তিনি বলেন : ‘যেভাবে নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে তিনি দেশ ছেড়েছেন, তাতে তার দলের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা প্রকাশ পায় না। হঠাৎ এই ধরনের বক্তব্য দেয়া হচ্ছে কেবল আলোচনায় থাকার জন্য। তা ছাড়া, তার এই উসকানিমূলক বার্তার কারণে তৃণমূলের কিছু বিভ্রান্ত নেতাকর্মী মাঠে নেমে গ্রেফতার বা বিপদের মুখে পড়ছেন, যা তাদের পরিবারের জন্য ক্ষতিকর।’
অন্য দিকে, ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান যোগ করেন, এটি মূলত একটি ‘রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজি’। দীর্ঘ দুই বছর ধরে দিকনির্দেশনাহীন ও মনোবলভাঙা কর্মীদের সাময়িকভাবে উজ্জীবিত রাখতেই ডিসেম্বরে ফেরার এই বিভ্রান্তিকর ঘোষণা দেয়া হয়েছে।



