বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার

সম্পদের অধিকারী না হয়েও বাবার দায় সন্তানের ঘাড়ে

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

উত্তরাধিকার থেকে প্রাপ্ত সম্পদ থেকে বাবার ঋণের দায় সন্তান পরিশোধ করবে- এটাই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সম্পদের অধিকারী হয়নি এমন দায় সন্তানের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সার্কুলারের মাধ্যমে। বলা হয়েছে, কারো ঋণের গ্যারান্টির ভিত্তিতে বাবার সৃষ্ট দায় বহন করতে হবে তার উত্তরসূরিদের।

বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা বলে সব ব্যাংকের জন্য অভিন্ন ‘পার্সোনাল গ্যারান্টি ফরম’ বাধ্যতামূলক করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা, আইনি জটিলতা কমানো এবং খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। তবে নীতিগত এই পদক্ষেপকে ঘিরে ব্যাংকিং খাত, আইনজীবী মহল এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে গুরুতর প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই ফরম ব্যাংককে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদান করলেও গ্যারান্টরের ন্যায্য অধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষাকে উপেক্ষা করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, অভিন্ন ‘পার্সোনাল গ্যারান্টি ফরম’: ব্যাংক সুরক্ষা নাকি গ্যারান্টরের অধিকার সঙ্কোচন?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যিনি ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেন ব্যাংকের নিয়ম ওই ঋণের একজন গ্রারান্টর হতে হয়। সাধারণত ঋণগ্রহীতার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বা অফিসের সহকর্মীরা ঋণের গ্যারান্টর হন। যিনি গ্যারান্টর হন তিনি ওই ঋণ বা সম্পদ ভোগ করেন না, শুধু আত্মীয়তার বন্ধনের কারণে ঋণের গ্যারান্টর হন।

সম্পদের অধিকারী না হয়েও বাবার দায় সন্তানের ঘাড়ে : বাংলাদেশ ব্যাংক জারিকৃত ‘পার্সোনাল গ্যারান্টি ফরম’ সার্কুলারের ৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই গ্যারান্টি আমার এবং আমার উত্তরসূরিদের ওপর ব্যাংকের অনুকূলে সৃষ্ট একটি আইনগত দায় এবং ব্যাংকের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন, ব্যাংক একীভূতকরণ বা ব্যাংকের অধিগ্রহণ সত্ত্বেও ওই দায় বহাল থাকবে।’ আলোচ্য ধারা সম্পর্কে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, সম্পদকে দায়যুক্ত করা যায়, দায়কে দায়যুক্ত করা যায় না। এখানে বাবা গ্যারান্টির বিপরীতে যে দায় সৃষ্টি করেছেন তার বিপরীতে উত্তরসূরিদের জন্য কোনো সম্পদ রেখে যাননি। সার্কুলার অনুযায়ী, সম্পদের অধিকারী না হয়েও শুধু দায়ের ভিত্তিতে গ্যারান্টরের সন্তানদের ঘাড়ে দায় চাপানো হচ্ছে, যা একজন নাগরিকের সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হচ্ছে। অপরদিকে বাবা যখন কারো ঋণের গ্যারান্টর হন তখন তার সন্তানদের কোনো অনুমোদন নেয়ার বিধান ফরমে রাখা হয়নি। আবার সন্তান যদি নাবালক বা ১৮ বছরের নিচে হন তখন তার সব ধরনের দায় থাকে বাবার ওপর। বাবার মৃত্যুর পর গ্যারান্টের দায় নাবালকের ওপর চাপানো অযৌক্তিক। আবার উত্তরসূরি বলতে বাবার সন্তানদেরকে বোঝানো হয়। কোনো অনাগত সন্তান জন্মের দুই বছর আগে বাবা কারো ঋণের গ্যারান্টর হলে সার্কুলার অনুযায়ী এর দায় উত্তরসূরি হিসেবে ওই সন্তানকেও বহন করতে হবে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মনে করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণের মূল সমস্যা গ্যারান্টি ফরমের ভিন্নতা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণ যাচাই, বড় করপোরেট ঋণে দায়মুক্তি সংস্কৃতি এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনার জবাবদিহির অভাব। এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে কেবল গ্যারান্টরের ওপর দায় চাপানো হলে খেলাপি ঋণ কমবে না; বরং সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধ বাড়বে।

এ দিকে সার্কুলারের সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে গ্যারান্টরের দায়কে ‘নিঃশর্ত ও অপ্রত্যাহারযোগ্য’ ঘোষণা করার বিষয়টি নিয়ে। নতুন ফরম অনুযায়ী, প্রধান দেনাদার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে গ্যারান্টরকে কোনো প্রশ্ন বা যুক্তিতর্ক ছাড়াই ব্যাংকের প্রথম দাবির সাত কর্মদিবসের মধ্যে সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধ করতে হবে। সমালোচকদের মতে, এটি গ্যারান্টরকে কার্যত ‘দ্বিতীয় দেনাদার’-এ পরিণত করেছে, যেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। এতে প্রাকৃতিক বিচারনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আরো বিতর্ক সৃষ্টি করেছে গ্যারান্টরের দায়কে প্রধান দেনাদারের দায়ের সাথে সমব্যাপী বা সহব্যাপী করার বিধান। এর ফলে ব্যাংক চাইলে প্রধান দেনাদারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়েই সরাসরি গ্যারান্টরের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে। বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে গ্যারান্টর হন পারিবারিক সদস্য, বন্ধু বা ব্যবসায়িক অংশীদার, যাদের প্রকৃত ঋণ ব্যবস্থাপনায় কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অথচ নতুন ফরম অনুযায়ী, তারা সমানভাবে আইনি ঝুঁকির মুখে পড়বেন।

আইনজীবীদের মতে, ডিক্রি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদিও প্রথমে প্রধান দেনাদারের সম্পত্তি আকৃষ্ট করার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, তবু তা ‘যতদূর সম্ভব’ শব্দবন্ধে সীমাবদ্ধ। এই অস্পষ্টতা আদালত ও ব্যাংকের হাতে ব্যাপক ব্যাখ্যাগত ক্ষমতা রেখে দেয়, যা ভবিষ্যতে গ্যারান্টরের সম্পত্তি দ্রুত জব্দের পথ সুগম করতে পারে।

নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে গ্যারান্টিকে ‘ধারাবাহিক নিরাপত্তা’ হিসেবে বিবেচনা করার বিধান নিয়েও। নতুন ফরমে বলা হয়েছে, ঋণের আংশিক পরিশোধ হলেও গ্যারান্টরের দায় অবসান হবে না। এমনকি ব্যাংক যদি ঋণ পুনঃতফসিল করে, সময় বাড়ায় বা শর্ত পরিবর্তন করে, তাতেও গ্যারান্টরের দায় অপরিবর্তিত থাকবে। সমালোচকদের মতে, এতে গ্যারান্টর সম্পূর্ণভাবে ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, যেখানে তার সম্মতি কার্যত আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে।

আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে ভাষাগত ও কাঠামোগত ভারসাম্য নিয়ে। যদিও ফরমটি বাংলা ও ইংরেজি, উভয় ভাষায় প্রণীত, তবে বাস্তবে আইনি শব্দচয়ন এতটাই জটিল যে সাধারণ গ্যারান্টরের পক্ষে এর প্রকৃত অর্থ ও ঝুঁকি অনুধাবন করা কঠিন। অনেকের আশঙ্কা, ব্যাংকগুলো এই ফরম ব্যবহার করে গ্রাহক ও গ্যারান্টরের কাছ থেকে ‘স্ট্যান্ডার্ড কনসেন্ট’ আদায় করবে, যেখানে দরকষাকষি বা শর্ত আলোচনার সুযোগ থাকবে না।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ক্ষেত্রেও এই ফরম নতুন সঙ্কট তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পারিবারিক বা সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গ্যারান্টর জোগাড় করে ঋণ নেন। নতুন কঠোর শর্তের কারণে ভবিষ্যতে কেউ গ্যারান্টর হতে আগ্রহী নাও হতে পারেন, যা উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি আরো কঠিন করে তুলবে। ফলে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিন্ন ‘পার্সোনাল গ্যারান্টি ফরম’ প্রণয়ন একটি প্রশাসনিকভাবে সহজ সমাধান হলেও এর প্রভাব বহুমাত্রিক এবং বিতর্কিত। ব্যাংক সুরক্ষার নামে গ্যারান্টরের অধিকার সঙ্কচিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ঋণ সংস্কৃতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের উচিত ছিল, এই ফরম চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের সাথে বিস্তৃত আলোচনা ও আইনি পর্যালোচনা করা। নচেৎ, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে নতুন ধরনের সঙ্কট ও আইনি বিরোধের জন্ম দিতে পারে, যা সমাধানের চেয়ে সমস্যা বাড়ানোর আশঙ্কাই বেশি।