নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং ২০০৮

অতিরিক্ত ব্যালট, গোয়েন্দা নকশা ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের গোপন ছক

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ‘ইঞ্জিনিয়ারড নির্বাচন’ বিতর্ক বিদ্যমান। বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য, সাক্ষ্য এবং অভ্যন্তরীণ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে উঠে আসে- নির্বাচনের আগেই ফল নির্ধারণের এক সুসংগঠিত প্রক্রিয়া চালু ছিল। এ বিষয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাংবাদিক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবু রূশদ একটি জাতীয় পত্রিকার কলামে। এতে তিনি এমন একটি কাঠামোবদ্ধ চিত্র তুলে ধরেছেন, যেখানে গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের একটি অংশের সম্ভাব্য ভূমিকা আলোচিত হয়েছে। এতে মূল কারিগর হিসেবে ওঠে এসেছে সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া সাবেক ডিজিএফআই প্রধান ও তদানীন্তন এফএসআইবি ব্যুরোর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখ মামুন খালেদ ও সিটিআইবির তদানীন্তন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ‘ইঞ্জিনিয়ারড নির্বাচন’ বিতর্ক বিদ্যমান। বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য, সাক্ষ্য এবং অভ্যন্তরীণ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে উঠে আসে- নির্বাচনের আগেই ফল নির্ধারণের এক সুসংগঠিত প্রক্রিয়া চালু ছিল। এ বিষয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাংবাদিক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবু রূশদ একটি জাতীয় পত্রিকার কলামে। এতে তিনি এমন একটি কাঠামোবদ্ধ চিত্র তুলে ধরেছেন, যেখানে গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের একটি অংশের সম্ভাব্য ভূমিকা আলোচিত হয়েছে। এতে মূল কারিগর হিসেবে ওঠে এসেছে সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া সাবেক ডিজিএফআই প্রধান ও তদানীন্তন এফএসআইবি ব্যুরোর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখ মামুন খালেদ ও সিটিআইবির তদানীন্তন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন।

১. গোয়েন্দা নজরদারি ও রাজনৈতিক ডেটাবেইস : ওয়ান-ইলেভেন (২০০৭) পরবর্তী সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব মূলত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের একটি বিশেষ ব্যুরোর হাতে ছিল। এই ব্যুরোর অধীনে গঠিত ‘স্পেশাল অপারেশন্স উইং’ সারা দেশের রাজনৈতিক দল, নেতাকর্মী এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও বিশদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করে।

এই ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত ছিল- রাজনৈতিক আনুগত্য; দুর্নীতির অভিযোগ; বিদেশী সংযোগ এবং মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয়তা। এই তথ্যভাণ্ডার পরবর্তীতে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২. লক্ষ্যভিত্তিক দমন-পীড়ন : অভিযোগ অনুযায়ী, এই তথ্য ব্যবহার করে বিশেষভাবে একটি রাজনৈতিক দল-বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। প্রশাসনে ‘বিএনপি-ঘেঁষা’ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেয়া হয়, পুলিশ বাহিনীতে পুনর্বিন্যাস করা হয় এবং রাজনৈতিক মামলার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয়। অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে কম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল- এমন বিষয়ও উঠে এসেছে।

৩. নির্বাচনের আগাম জরিপ- বাস্তবতা বনাম নির্দেশনা : গোপন জরিপ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিএনপি এককভাবে ১৫৫-১৬০ আসনে এগিয়ে ছিল, জোটভিত্তিক নির্বাচনে এই সংখ্যা আরো বাড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু একই সাথে একটি ‘কঠোর নির্দেশনা’ দেয়া হয়েছিল- বিএনপিকে ৩০টির বেশি আসন দেয়া যাবে না। এই নির্দেশনা দেন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। তিনি কোনোভাবেই বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে দেবেন না। এর সাথে একটি প্রতিবেশী দেশের প্রভাবও জড়িত।

এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য ‘নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং’ শুরু হয় এ টি এম আমিন শেখ মামুন খালেদের তত্ত্বাবধানে।

৪‘নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং’-কীভাবে

কাজ করার কথা ছিল : নির্বাচনি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রক্রিয়ায় কয়েকটি ধাপ ছিল- ক. অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো : নির্দিষ্ট আসনের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যালট ছাপানো হয়। এই প্রক্রিয়া তদারকির অভিযোগ ওঠে গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশের বিরুদ্ধে।

খ. ব্যালট পরিবহন : অতিরিক্ত ব্যালট নির্দিষ্ট আসনে গোপনে পাঠানো হয়। পরিবহনে ব্যবহার করা হয় প্রশাসনিক ও আধাসামরিক লজিস্টিক।

গ. স্থানীয় সমন্বয় : নির্বাচনী কর্মকর্তাদের একটি অংশকে প্রভাবিত করা হয় এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

ঘ. রাজনৈতিক সমঝোতা ও চাপ : কিছু কর্মকর্তাকে পদোন্নতি ও পোস্টিংয়ের প্রলোভন দেয়া হয়; ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর আর্থিক চাপ প্রয়োগ করা হয়।

৫. প্রতিদ্বন্দ্বী দলের তথ্য অপসারণ : আবু রূশদের তথ্যে উল্লেখ করা হয়- একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের (বিএনপি) অফিসে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে সব ডেটা সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে আগাম সতর্ক করে তথ্য সরিয়ে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। এর ফলে নির্বাচনী মাঠে তথ্যগত অসমতা তৈরি হয়।

৬. অভ্যন্তরীণ দ্বিধা ও পেশাদার কর্মকর্তাদের অবস্থান : সব কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন না। কিছু পেশাদার কর্মকর্তা এই কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা হয়। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে তথ্য ফাঁস করার চেষ্টা করেন। আর গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যেও মতবিরোধ ছিল।

৭. আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্ন : বিভিন্ন সূত্রের উল্লেখ করে আবু রূশদ উল্লেখ করেন, একটি আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে; কূটনৈতিক মহলেও নির্বাচনের ফল নিয়ে আগাম ধারণা ছিল। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

৮. রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত : নির্বাচনের আগে বিরোধী নেতৃত্বের কাছে এই তথ্য পৌঁছালেও শুরুতে তা অবিশ্বাস্য মনে হয়। এ সময় নির্বাচন বর্জনের চিন্তা উঠেছিল; কিন্তু জোটের অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হয়।

৯. দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব : এই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রভাব ছিল গভীর। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থাহীনতা, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রশাসনের রাজনৈতিককরণ এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব নিরঙ্কুশভাবে বৃদ্ধি পায়।

১০. সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি : এই বয়ানের বিপরীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও থাকতে পারে। এসব তথ্যের কতটা প্রমাণযোগ্য? নির্বাচনের ফল কি কেবল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফল, নাকি জনসমর্থনের প্রতিফলনও ছিল? রাজনৈতিক পক্ষপাত কি এই বর্ণনাকে প্রভাবিত করেছে?

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলের দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থা, জনমত এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

সব মিলিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ‘অতিরিক্ত ব্যালট পেপার’ ও ‘নির্বাচনি ইঞ্জিনিয়ারিং’ সংক্রান্ত অভিযোগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক। এই অনুসন্ধানী বয়ান একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

তবে চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন- স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত; নথিভিত্তিক প্রমাণ এবং বহুপক্ষীয় সাক্ষ্য যাচাই। কারণ ইতিহাসের এই অধ্যায় শুধু অতীত নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।