সাক্ষাৎকার : নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবু রুশদ

মেজর মোজাফফরই জিয়া হত্যা রহস্যের শেষ ‘মিসিং লিংক’

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবু রুশদ বলেছেন, সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া মেজর মোজাফফর হোসেন জিয়াউর রহমান হত্যা রহস্য উদ্ঘাটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সম্ভবত ‘শেষ মিসিং লিংক’। তার মতে, জিয়া হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত বিচার হয়নি; ১৯৮১ সালে যে বিচার হয়েছিল, তা ছিল কেবল সেনা বিদ্রোহের অভিযোগে, রাষ্ট্রপতি হত্যার অভিযোগে নয়। তিনি বলেন, মেজর মোজাফফর দীর্ঘদিন ভারত ও বাংলাদেশে ভিন্ন পরিচয়ে বসবাস করেছেন এবং কিভাবে তিনি এত বছর আত্মগোপনে ছিলেন, সেটিও তদন্তের বিষয়।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের পর এ সংক্রান্ত নানা বিষয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেন সাবেক সেনাকর্মকর্তা নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাংবাদিক আবু রুশদ। তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার সাথে তার দীর্ঘদিনের আলাপ থেকে জানা যায়, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতি জিয়াউর রহমানকে গুলি করেছিলেন এবং মেজর মোজাফফর হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

তিনি আরো বলেন, সরকারি শ্বেতপত্রে একাধিকবার সংশোধন আনা হয়েছিল এবং মেজর জেনারেল মঞ্জুরের মৃত্যুও রহস্যজনক। তার মতে, ঘটনার প্রকৃত সত্য জানতে মেজর মোজাফফরের জবানবন্দীর পাশাপাশি তখনকার জীবিত সামরিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্যাও যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি সরকারের প্রতি পূর্ণাঙ্গ, নিরপে তদন্তের আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের জানার অধিকার রয়েছে জিয়াউর রহমান হত্যার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী কারা ছিলেন, এতে কোনো রাজনৈতিক বা বিদেশী শক্তির সম্পৃক্ততা ছিল কি না এবং কেন এত বছরেও হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়নি।

নিচে আবু রুশদের সাাৎকারের বিস্তারিতÑ

প্রশ্ন : সম্প্রতি মেজর (অব:) মোজাফফর হোসেন গ্রেফতার হয়েছেন। অনেকেই বলছেন, তিনি জিয়া হত্যাকাণ্ডের একমাত্র জীবিত অভিযুক্ত ছিলেন। বিষয়টি কতটা সঠিক?

আবু রুশদ : এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। মেজর মোজাফফরের পাশাপাশি আরো অন্তত দু’জন কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। একজন ছিলেন মেজর মইন। তিনি প্রথমে ভারতে, পরে কানাডায় যান। পরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করলে তার বিরুদ্ধে কেবল সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে যাওয়ার (ডেজারশন) অভিযোগে বিচার হয় এবং এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সাজা শেষে তিনি আবার কানাডায় চলে যান এবং এখনো সেখানেই আছেন।

আরেকজন ছিলেন মেজর খালেদ। তিনি ভারত নয়, মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ডে চলে যান এবং ১৯৯৩ সালে সেখানে মারা যান। পরে তার লাশ বাংলাদেশে এনে দাফন করা হয়।

প্রশ্ন : মেজর মোজাফফর কিভাবে এত বছর আত্মগোপনে থাকতে পেরেছিলেন?

আবু রুশদ : যতটুকু জানা যায়, ভারতে গিয়ে তিনি অন্তত দু’টি ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করতেন একটি বিপ্লব সরকার, অন্যটি ব্যানার্জি নামে। ওই পরিচয়ে তার পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি হয়েছিল। একটি দেশের রাষ্ট্রপতি হত্যার পর অন্য দেশে গিয়ে এভাবে পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট পাওয়া কোনো রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব কি না এটি বড় প্রশ্ন। পরে তিনি ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যেও গিয়েছেন বলে তথ্য রয়েছে। এমনকি থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সাথেও দেখা করেছিলেন।

প্রশ্ন : পরে কি তিনি বাংলাদেশেও ফিরেছিলেন?

আবু রুশদ : হ্যাঁ। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং ভিন্ন নামে কাগজপত্র তৈরি করেন। ব্যবসা করেন, বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেন। এমনকি বনানী ডিওএইচএসের মতো সংরতি এলাকায়ও দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। যতটুকু জানা গেছে, তিনি একজন সাবেক মেজর জেনারেলের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। ফলে প্রশ্ন ওঠে এত বছর তিনি কিভাবে নির্বিঘেœ দেশে ছিলেন?

প্রশ্ন : আপনার জানা তথ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানকে গুলি করেছিলেন কে?

আবু রুশদ : দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে আমি বহু সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তার সাাৎকার নিয়েছি। তাদের কাছ থেকে যে তথ্য পেয়েছি, তাতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতি গুলি করেছিলেন। পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুবসহ পালানোর সময় সেনাবাহিনীর সাথে গোলাগুলিতে তারা নিহত হন।

প্রশ্ন : মেজর মোজাফফরের ভূমিকা কী ছিল?

আবু রুশদ : তিনি পুরো অপারেশনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। পরিকল্পনার বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। হত্যার পর জিয়াউর রহমানের লাশ গোপনে দাফনের কাজেও তিনি ছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

প্রশ্ন : জিয়া হত্যা মামলার কি কখনও বিচার হয়েছিল?

আবু রুশদ : না। যা হয়েছিল, তা ছিল সেনা বিদ্রোহের বিচার। ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শালে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং কয়েকজনের কারাদণ্ড হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হত্যার বিচার হয়নি। হত্যা মামলা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১৭৩ বা ১৭৭ বার পিছিয়েছে। অবশেষে ২০০১ সালে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়। ফলে প্রকৃত হত্যার বিচার আজও হয়নি।

প্রশ্ন : আপনি শ্বেতপত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, কিন্তু কেন?

আবু রুশদ : জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর যে শ্বেতপত্র প্রকাশিত হয়েছিল, সেটি তিনবার সংশোধন করা হয়। প্রথমে কর্নেল মাহফুজকে বীরের মতো উপস্থাপন করা হয়েছিল। পরে সেই অবস্থান বদলে যায়। পরবর্তীতে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট কোথায় থাকবেন, কখন কোথায় যাবেন এসব তথ্য হত্যাকারীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন কর্নেল মাহফুজ। এমনকি প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় থাকা দুই কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ওঠে।

প্রশ্ন : মেজর জেনারেল মঞ্জুর কি প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ছিলেন?

আবু রুশদ : সরকারি বর্ণনায় তাকে প্রধান পরিকল্পনাকারী বলা হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে তিনি কি সত্যিই হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন, নাকি জিয়াউর রহমানকে আটক করে রাজনৈতিক কোনো দাবি আদায় করতে চেয়েছিলেন? এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।

প্রশ্ন : মেজর জেনারেল মঞ্জুরের মৃত্যুও কি রহস্যজনক?

আবু রুশদ : সরকারি বক্তব্য ছিল, গ্রেফতারের পর উত্তেজিত সৈন্যরা তাকে হত্যা করে। কিন্তু আমি যেসব কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছি, তাদের কাছ থেকে ভিন্ন তথ্য পেয়েছি। এ ছাড়া তৎকালীন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন চৌধুরী তার বইয়েও লিখেছেন, ঢাকা থেকে যাওয়া একজন কর্মকর্তা মঞ্জুরকে গুলি করে হত্যা করেন। বিষয়টি অবশ্যই তদন্তসাপে।

প্রশ্ন : তাহলে মেজর মোজাফফরের গুরুত্ব কোথায়?

আবু রুশদ : আমার মতে, তিনি পুরো ঘটনার শেষ ‘মিসিং লিংক’। তবে তিনি নিজের দায় কমানোর জন্য বিভ্রান্তিকর তথ্যও দিতে পারেন। তাই তার বক্তব্য অবশ্যই জীবিত প্রত্য সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে দেখা উচিত।

প্রশ্ন : বর্তমান সময়ে কারা এই তদন্তে সহায়তা করতে পারেন?

আবু রুশদ : সে সময় সেনাসদর, সামরিক গোয়েন্দা, সামরিক অপারেশন এবং আদালত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা এখনো জীবিত আছেন। তাদের মধ্যে ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শালের প্রধান কৌঁসুলি মেজর জেনারেল আমসা আমিন বীরপ্রতীক এবং ডিফেন্স টিমের সদস্যদের মধ্যে সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম জীবিত আছেন। সরকার চাইলে তাদের কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে পারে।

প্রশ্ন : মেজর মোজাফফরের বিরুদ্ধে এখন কী ধরনের বিচার হতে পারে?

আবু রুশদ : সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত। যদি সেনা আইনে বিচার হয়, তাহলে ডেজারশন বা সেনা বিদ্রোহের অভিযোগ আসতে পারে। আর যদি রাষ্ট্রপতি হত্যার অভিযোগে বিচার হয়, তাহলে তা বেসামরিক আদালতেই করতে হবে। এ ছাড়া সরকার জানিয়েছে, তিনি অন্য একটি মামলাতেও অভিযুক্ত হয়েছেন।

প্রশ্ন : আপনার নিজের অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কী পেয়েছেন?

আবু রুশদ : আমি তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল মহব্বত জান চৌধুরীর সাাৎকার নিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, চট্টগ্রামে গেলে বিপদ হতে পারে এমন সতর্কবার্তা তিনি জিয়াউর রহমানকে দিয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবেও অনুরোধ করেছিলেন না যেতে, কিংবা গেলে সন্ধ্যার মধ্যে ঢাকায় ফিরে আসতে। কিন্তু জিয়াউর রহমান সেই পরামর্শ গ্রহণ করেননি। অন্য দিকে, ঘটনার গভীর দিক নিয়ে আমি যাদেরই প্রশ্ন করেছি, প্রায় সবাই ‘নো কমেন্ট’ বলেছেন। সেটিও অনেক কিছু ইঙ্গিত করে।

প্রশ্ন : সবশেষে আপনার মূল্যায়ন কী?

আবু রুশদ : বাংলাদেশের মানুষের জানার অধিকার রয়েছে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী কারা ছিলেন, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা বিদেশী সম্পৃক্ততা ছিল কি না এবং কেন প্রকৃত হত্যার বিচার হয়নি।

আমার মতে, মেজর মোজাফফর এই রহস্যের শেষ গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। সরকার যদি তার তথ্য যাচাই-বাছাই করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে, তাহলে হয়তো দীর্ঘদিনের বহু অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে।