সাকী মাহবুব
সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মানুষ সময়ের স্রোতে এগিয়ে চলে, কিন্তু সময় কখনো ফিরে আসে না। নতুন বছর মূলত সময়ের এই অবিরাম প্রবাহেরই একটি স্মারক। একজন মুমিনের কাছে নতুন বছর কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয়; বরং এটি নিজেকে পরিমাপ করা, ভুল সংশোধন করা এবং আল্লাহর দিকে নতুন করে ফিরে যাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে শপথ করেছেন-
‘শপথ সময়ের, নিশ্চয়ই মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত; তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’
(সূরা আল-আসর: ১৩) এই আয়াত স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে সময় যদি ঈমান ও সৎকর্মে ব্যয় না হয়, তবে তা মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই নতুন বছর একজন মুমিনকে প্রশ্ন করতে শেখায়। গত বছরে তার ঈমান কতটা দৃঢ় হয়েছে, তার আমল কতটা বিশুদ্ধ ছিল? মুমিন বিশ্বাস করেন, প্রতিটি নতুন দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুযোগ। এই সুযোগ হয়তো আর নাও আসতে পারে। রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত : সুস্থতা ও অবসর সময়’(সহিহ বুখারি)। নতুন বছর এসে একজন মুমিনকে এই অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সে উপলব্ধি করে যে তার জীবন থেকে আরো একটি বছর কমে গেলো, মৃত্যুর দিন আরো কাছে এলো। ফলে তার অন্তরে আখিরাতের প্রস্তুতির তাগিদ আরো তীব্র হয়। একজন প্রকৃত মুমিন নতুন বছরে আনন্দ-উল্লাস ও ভোগ-বিলাসে ডুবে যাওয়ার পরিবর্তে তওবা, ইস্তিগফার ও আত্মশুদ্ধির দিকে মনোযোগী হন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করো’(সূরা আত-তাহরিম : ৮)। নতুন বছর তাই মুমিনের কাছে গুনাহ থেকে ফিরে আসার, নামাজে যতœবান হওয়ার, কুরআনের সাথে সম্পর্ক গভীর করার এবং চরিত্র সংশোধনের এক নতুন সূচনা। রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাব গ্রহণ করে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেয়’ (তিরমিজি)। এই হাদিস অনুযায়ী, নতুন বছর একজন মুমিনকে আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়। সে নিজের কাজের হিসাব নেয়, কোথায় সে আল্লাহর হুকুম মানেনি, কোথায় মানুষের হক নষ্ট করেছে এবং কিভাবে সেসব ভুল সংশোধন করা যায়। ইসলামে নতুন বছর উদযাপনের নামে অপচয়, অশ্লীলতা বা অনৈতিকতা অনুমোদিত নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’(সূরা আল-আন‘আম: ১৪১)।
তাই মুমিন নতুন বছর শুরু করতে চান দোয়া, নফল ইবাদত ও কল্যাণকর নিয়তের মাধ্যমে। একই সাথে তিনি সমাজের প্রতিও নিজের দায়িত্ব অনুভব করেন গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়ানো, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে থাকা এবং মানুষের উপকারে আসাই হয় তার অঙ্গীকার।
পরিশেষে বলা যায়, মুমিনের ভাবনায় নতুন বছর হলো আত্মগঠন ও আল্লাহমুখী জীবনের নবায়ন। যে ব্যক্তি নতুন বছরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে, তার জীবন হয় অর্থবহ এবং তার ভবিষ্যৎ হয় আলোকিত ইহকাল ও আখিরাত উভয় জগতে।



