এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ২১২টি আসনে বিজয়ী হয়ে ভোট পেয়েছে ৫১.০৭ শতাংশ। তাদের আসন ৭১.৩৮ শতাংশ। আর জামায়াত জোট ৭৭টি আসনে জয়ী হয়ে ভোট পেয়েছে ৩৮.৬২ শতাংশ। তাদের আসন ২৫.৯২ শতাংশ। সাড়ে ১২ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে বিএনপি অধিক আসন পেয়েছে ৫৫ শতাংশ। ২৯৯ আসনে ভোট গ্রহণ হলেও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের গেজেট প্রকাশ করা হয়নি বলে ইসি থেকে জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে- এবারের নির্বাচনে দল ভিত্তিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি ২৯০ জন প্রার্থী দিয়ে প্রায় সব আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ভোটের ৪৯.৯৭ শতাংশ পেয়েছে। যা এককভাবে প্রায় অর্ধেক ভোটারের সমর্থন নির্দেশ করে। এই ফলাফল বিএনপিকে নির্বাচনের প্রধান নিয়ামক শক্তিতে পরিণত করেছে। বিএনপি জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ০.৪৭ শতাংশ, গণ অধিকার পরিষদ ০.৩৩ শতাংশ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ০.৪ শতাংশ ও নাগরিক ঐক্য ০.১ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
অন্য দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২২৭ জন প্রার্থী দিয়ে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আসন পেয়েছে ৬৮। আসন সংখ্যার তুলনায় ভোটের হার অনেক বেশি নিয়ে দলটি দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগঠিত ভোটব্যাংক হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। জোটের শরিক দল এনসিপি ৩.০৫ শতাংশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২.০৯ শতাংশ, খেলাফত মজলিস ০.৭৬ শতাংশ এলডিপি ০.৩৫ শতাংশ, এবি পার্টি ০.২৮ শতাংশ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ০.১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সংখ্যা, প্রতীক এবং প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়- এবারের ভোটযুদ্ধে একদিকে বড় দলগুলোর আধিপত্য, অন্যদিকে বহু ক্ষুদ্র দলের প্রতীকী উপস্থিতি মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক; কিন্তু অসম প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।
ধর্মভিত্তিক আরেকটি দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৭ জন প্রার্থী দিয়ে ২.৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। যদিও ভোটের হার সীমিত, তবুও সারা দেশে প্রার্থী দেয়ার মাধ্যমে তাদের সাংগঠনিক বিস্তার দৃশ্যমান।
জাতীয় রাজনীতির পুরনো খেলোয়াড় জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) ১৯৯ জন প্রার্থী দিয়ে পেয়েছে ০.৮৯ শতাংশ ভোট। অতীতের তুলনায় এই হার অনেক কম, যা দলটির জনভিত্তি তলানিতে ইঙ্গিত দেয়।
এ ছাড়া কয়েকটি ছোট ও মাঝারি দল সীমিত ভোট পেয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (০.৪৫%), কমিউনিস্ট পার্টি (০.০৮%) ইত্যাদি।
বেশির ভাগ ক্ষুদ্র দল ০.০-০.১০ শতাংশের মধ্যে ভোট পেয়েছে- যা কার্যত প্রতীকী উপস্থিতি ছাড়া কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি। অনেক দল শতাধিক প্রার্থী দিলেও ভোটের হার শূন্যের কাছাকাছি। যা সংগঠন ও জনভিত্তির দুর্বলতার প্রমাণ।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সম্মিলিতভাবে ৫.৭৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন এবং ২৭৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন- এটি দেখায় স্থানীয় জনপ্রিয়তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে।
সামগ্রিকভাবে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সংখ্যা ছিল ২০২৮ জন। ফলাফল বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রবণতা স্পষ্ট : প্রথমত, ভোট ব্যাপকভাবে একটি বড় দলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ধর্মভিত্তিক দলগুলো মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য; কিন্তু বিভক্ত ভোট পেয়েছে। তৃতীয়ত, ছোট দলগুলোর সংখ্যা বেশি হলেও বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব খুবই সীমিত।
সব মিলিয়ে এই নির্বাচনী পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘বহুদলীয় অংশগ্রহণ, কিন্তু ক্ষমতায় একক আধিপত্য’-এর একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে টিকে থাকতে ছোট দলগুলোর জন্য জোটভিত্তিক কৌশল বা আদর্শিক পুনর্গঠন ছাড়া বিকল্প পথ খুব কম বলেই মনে হচ্ছে।



